ভূমিকা
ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে রবার্ট ক্লাইভ (Robert Clive) একজন অত্যন্ত পরিচিত ও আলোচিত নাম। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক চতুর সামরিক কর্মকর্তা এবং বাংলায় ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান স্থপতি। সাধারণ একজন কেরানি বা রাইটার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করে নিজ মেধা, কূটনৈতিক চাতুর্য এবং দূরদর্শিতার মাধ্যমে তিনি মেজর-জেনারেল পদে উন্নীত হন এবং বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৭৫৭ সালের ঐতিহাসিক পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলায় স্বাধীন নবাবী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী হিসেবে তিনি ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী হয়ে আছেন।
রবার্ট ক্লাইভের পরিচয় ও প্রাথমিক জীবন
রবার্ট ক্লাইভ ১৭২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের শ্রপশায়ারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি অত্যন্ত দুঃসাহসী ও একগুঁয়ে স্বভাবের ছিলেন। ১৭৪৩ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে একজন শিক্ষানবিস কেরানি (Writer) হিসেবে কাজ শুরু করতে ভারতে (মাদ্রাজ/ চেন্নাই) আসেন। পরবর্তীতে তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন এবং ফরাসিদের সাথে কোম্পানির যুদ্ধে নিজের যুদ্ধকৌশল ও নেতৃত্বের স্বাক্ষর রাখেন।
বাংলায় রবার্ট ক্লাইভের আগমন ও পলাশীর যুদ্ধ
১৭৫৬ সালে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা কলকাতা আক্রমণ করে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ দখল করলে, মাদ্রাজে থাকা রবার্ট ক্লাইভকে কলকাতা পুনর্দখলের জন্য পাঠানো হয়। ক্লাইভ অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে নবাবের অভ্যন্তরীণ দরবারের অসন্তোষের সুযোগ নেন এবং নবাবের প্রধান সেনাপতি মির্জাফর, শেঠ পরিবার ও উমিচাঁদের সাথে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর প্রান্তরে নবাবের বিশাল বাহিনীর সাথে কোম্পানির স্বল্পসংখ্যক সৈন্যের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মির্জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে নবাব পরাজিত ও পরবর্তীতে নিহত হন। এই জয়ের মাধ্যমে ক্লাইভ মির্জাফরকে সিংহাসনে বসান এবং প্রকৃতপক্ষে বাংলার শাসনক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে নিয়ে আসেন।
দেওয়ানি লাভ ও দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা (Double Government)
১৭৬৫ সালে রবার্ট ক্লাইভ দ্বিতীয়বারের মতো বাংলায় গভর্নর হিসেবে ফিরে আসেন। এসময় তিনি মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে ‘দেওয়ানি’ (রাজস্ব আদায়ের অধিকার) লাভ করেন। দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে তিনি বাংলায় “দ্বৈত শাসন” (Double Government) ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন।
- দ্বৈত শাসনের স্বরূপ: এই ব্যবস্থায় নবাবের হাতে থাকে প্রশাসনিক দায়িত্ব (ক্ষমতাহীন দায়িত্ব), আর কোম্পানির হাতে থাকে রাজস্ব আদায় ও সামরিক ক্ষমতা (দায়িত্বহীন ক্ষমতা)।
- ফলাফল: দ্বৈত শাসনের ফলে কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যাপক লুটপাট ও অত্যাচারে বাংলার অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, যা ১৭৭০ সালের (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) ভয়াবহ ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ বা দুর্ভিক্ষের অন্যতম কারণ ছিল।
ক্লাইভের অর্জন ও সাফল্য
কোম্পানির দৃষ্টিকোণ থেকে ক্লাইভ ছিলেন একজন সফল বীর। তিনি কেবল পলাশীর যুদ্ধই জয় করেননি, বরং বক্সারের যুদ্ধের পর কোম্পানির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি শক্ত করেন। তিনি কোম্পানির কর্মকর্তাদের দুর্নীতি দমনে এবং সামরিক বাহিনী পুনর্গঠনে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বাংলায় সফলতার পর তাঁকে ইংল্যান্ডে ‘লর্ড ক্লাইভ, ব্যারন অব প্লাসি’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
ক্লাইভের শেষ জীবন
জীবনভর অঢেল সম্পদের মালিক হলেও ভারতে তাঁর সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। যদিও সংসদ তাঁকে মুক্ত ঘোষণা করে, তবুও মানসিক অবক্ষয় ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে ১৭৭৪ সালের ২২ নভেম্বর তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
উপসংহার
সামগ্রিক আলোচনা শেষে বলা যায়, রবার্ট ক্লাইভ ছিলেন একাধারে একজন দক্ষ সামরিক অধিনায়ক, দূরদর্শী রাজনৈতিক চাণক্য এবং এক সাম্রাজ্যবাদী শাসক। উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে স্থানীয় শাসকদের দুর্বলতা ও কোন্দলকে কাজে লাগিয়ে তিনি যেভাবে ব্রিটিশ রাজত্বের গোড়াপত্তন করেছিলেন, তা ভারতীয় মহাদেশের ইতিহাসকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। একজন চতুর কূটনীতিতাজ হিসেবে তাঁর সাফল্য স্বীকৃত হলেও, তাঁর নীতি ও দ্বৈত শাসনের ফলে বাংলার আর্থ-সামাজিক বিপর্যয় তাঁকে ইতিহাসে এক বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছে।


