ভূমিকা
বাংলার ইতিহাসের এক অত্যন্ত সংকটময় ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হলো আলিনগরের সন্ধি। ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে নবাব সিরাজউদ্দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্য ও ষড়যন্ত্র দমনকল্পে কলকাতা আক্রমণ করেন এবং ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ দখল করে কলকাতার নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘আলিনগর’। কিন্তু দাক্ষিণাত্য থেকে লর্ড ক্লাইভ ও অ্যাডমিরাল ওয়াটসন জল ও স্থলপথে সৈন্যদল নিয়ে এসে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে পুনরায় কলকাতা দখল করে নেন। পরবর্তীতে নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি লর্ড ক্লাইভের মধ্যে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৯ ফেব্রুয়ারি যে বিখ্যাত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তা ইতিহাসে **’আলিনগরের সন্ধি’** নামে পরিচিত।
সন্ধির প্রেক্ষাপট
কলকাতা পুনর্দখলের পর ইংরেজদের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আরও বৃদ্ধি পায়। তারা হুগলি আক্রমণ ও ধ্বংস করে নবাবকে আরও চাপের মুখে ফেলে। অন্যদিকে, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে আহমদ শাহ আবদালীর ভারত আক্রমণের আশঙ্কা এবং অভ্যন্তরীণ দরবারি ষড়যন্ত্রের কারণে নবাব সিরাজউদ্দৌলা চতুর্মুখী সংকটে পড়েন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্রিটিশদের সাথে কালক্ষেপণ না করে একটি শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়াকেই নবাব রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক মনে করেন।
আলিনগরের সন্ধির প্রধান শর্তাবলি
আলিনগরের সন্ধির শর্তগুলো সম্পূর্ণরূপে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনুকূলে এবং নবাবের ক্ষমতার জন্য অত্যন্ত অপমানজনক ও ক্ষতিকর ছিল। সন্ধির প্রধান শর্তগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো:
- বাণিজ্যিক অধিকার পুনর্বহাল: মোগল সম্রাট কর্তৃক ইংরেজদের প্রদত্ত পূর্বের সকল বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার নবাব পুনরায় স্বীকার করে নেন।
- বিনা শুল্কে বাণিজ্যের অধিকার: কোম্পানি বাংলায় সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত বাণিজ্য করার অধিকার লাভ করে এবং দস্তকের (বাণিজ্যিক ছাড়পত্র) অবাধ ব্যবহারের অনুমতি পায়।
- ক্ষতিপূরণ প্রদান: নবাবের কলকাতা আক্রমণের সময় ইংরেজ কোম্পানির যে ক্ষতি হয়েছিল, নবাব তার ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হন এবং ইংরেজদের লুণ্ঠিত সকল দ্রব্য ও সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
- দুর্গ সংস্কার ও নির্মাণ: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতায় তাদের ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ পুনরায় সংস্কার ও সামরিক প্রয়োজনে সুরক্ষিত করার পূর্ণ অধিকার লাভ করে।
- মুদ্রা তৈরির অধিকার: ইংরেজদের নিজেদের নামে কলকাতায় নিজস্ব টাঁকশাল স্থাপন করে মুদ্রা তৈরি ও চালুর অধিকার প্রদান করা হয়।
- মিত্রতা চুক্তি: উভয় পক্ষ একে অপরের শত্রুকে নিজের শত্রু এবং একে অপরের মিত্রকে নিজের মিত্র বলে গণ্য করার অঙ্গীকার করে।
আলিনগরের সন্ধির গুরুত্ব ও ফলাফল
আলিনগরের সন্ধি বাংলার রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের ওপর এক প্রচণ্ড আঘাত হানে। এর ফলে:
- কোম্পানির শক্তি বৃদ্ধি: এই সন্ধির মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কেবল একটি বণিক দল থেকে একটি স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তির সমকক্ষে উন্নীত হয়।
- নবাবের দুর্বলতা প্রকাশ: নবাবের সাময়িক পিছু হটা ও অপমানজনক শর্ত মেনে নেওয়া তাঁর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে দরবারি ষড়যন্ত্রকারীদের সামনে উন্মোচিত করে দেয়।
- পলাশীর যুদ্ধের ভিত্তি স্থাপন: সন্ধির পর ইংরেজরা নবাবের ওপর পূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয় এবং ফরাসি ঘাটি চন্দননগর দখল করে নবাবের রাজনৈতিক শক্তি আরও নিঃশেষ করে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত ১৭৫৭ সালের ২৩ জুনের পলাশীর ট্র্যাজেডির পথ প্রশস্ত করে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, আলিনগরের সন্ধি ছিল নবাব সিরাজউদ্দৌলার জন্য এক বাধ্যবাধকতামূলক ও কৌশলগত পিছু হটা, যা বাস্তবে তাঁর পতনকে ত্বরাণ্বিত করেছিল। লর্ড ক্লাইভের ধূর্ত কূটনীতি এবং ইংরেজদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের কাছে নবাবকে এই অপমানজনক চুক্তি স্বাক্ষর করতে হয়েছিল। এটি কেবল বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রভাব সুদৃঢ় করেনি, বরং ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।


