ভূমিকা
উপমহাদেশের ইতিহাস ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘মীর জাফর’ একটি অত্যন্ত আলোচিত এবং বিতর্কিত নাম। বাংলা, বিহার ও ওড়িশার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করলেও, পরবর্তীতে ইতিহাসের পাতায় বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে তাঁর নজিরবিহীন প্রপঞ্চনা ও ক্ষমতার লিপ্সার কারণে বাংলার স্বাধীনতা সূর্যাস্তমিত হয় এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রায় দুইশত বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
মীর জাফরের পরিচয় ও প্রারম্ভিক জীবন
মীর জাফরের পুরো নাম মীর জাফর আলী খান। তিনি ছিলেন আরব বংশোদ্ভূত। ভাগ্য অন্বেষণে তিনি ভারতে আগমন করেন এবং নবাব আলীবর্দী খানের অধীনে সেনা বিভাগে যোগ দেন। স্বীয় দক্ষতা ও বিচক্ষণতার গুণে তিনি দ্রুত পদোন্নতি লাভ করেন এবং নবাব আলীবর্দী খানের সৎবোন শাহ খানমকে বিয়ে করে নবাব পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ হন। এই পারিবারিক ও প্রশাসনিক প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে তিনি পরবর্তীতে নবাবের প্রধান সেনাপতি বা ‘বক্সি’ পদে অধিষ্ঠিত হন।
ষড়যন্ত্র ও পলাশীর যুদ্ধে ভূমিকা
নবাব আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর তাঁর দৌহিত্র তরুণ সিরাজউদ্দৌলা বাংলার মসনদে আরোহণ করলে মীর জাফর তা সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। নবাবের কম অভিজ্ঞতা ও ক্ষমতার মোহ মীর জাফরকে ষড়যন্ত্রের দিকে চালিত করে। তিনি ঘসেটি বেগম, রাজবল্লভ, জগৎশেঠ এবং ইংরেজ বণিক রবার্ট ক্লাইভের সাথে এক গোপন চুক্তিতে আবদ্ধ হন। চুক্তি অনুযায়ী স্থির হয় যে, নবাবকে উৎখাত করে মীর জাফরকে মসনদে বসানো হবে এবং বিনিময়ে ইংরেজদের বিপুল অর্থ ও বাণিজ্যিক সুবিধা প্রদান করা হবে।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রাঙ্গণে ইংরেজ বাহিনীর সাথে যুদ্ধ শুরু হলে প্রধান সেনাপতি মীর জাফর বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁর এই বিশ্বাসঘাতকতার কারণে নিশ্চিত বিজয়ের মুখে থাকা সত্ত্বেও নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত ও পরবর্তীতে নিহত হন।
নবাবিত্ব ও পরিণতি
পলাশীর যুদ্ধের পর ইংরেজদের অনুকম্পায় মীর জাফর বাংলার মসনদে বসেন। তবে তিনি স্বাধীন নবাব হিসেবে কাজ করতে পারেননি; বরং ইংরেজদের হাতের পুতুলে পরিণত হন। ইংরেজদের সীমাহীন অর্থের দাবি মেটাতে ব্যর্থ হওয়ায় ১৭৬০ সালে তাঁকে মসনদচ্যুত করে তাঁর জামাতা মীর কাশিমকে বসানো হয়। পরবর্তীতে মীর কাশিম ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে ১৭৬৩ সালে ইংরেজরা পুনরায় মীর জাফরকে মসনদে বসায়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, মীর জাফর ছিলেন এমন এক ঐতিহাসিক চরিত্র যাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা, ক্ষমতার অন্ধ মোহ এবং দেশপ্রেমের অভাব সমগ্র উপমহাদেশের ইতিহাসকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ১৭৬৫ সালে তাঁর মৃত্যুর পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে ‘মীর জাফর’ নামটি কোনো ব্যক্তির পরিচয়ের চেয়ে বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।


