১৯৪৬ সালের মন্ত্রিমিশন পরিকল্পনা কেন ব্যর্থ হয়েছিল?

অথবা, ১৯৪৬ সালের মন্ত্রিমিশন পরিকল্পনার ব্যর্থতার কারণ কি?

​ভূমিকা
​দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতিতে ভারতের স্বাধীনতা ও শাসনতন্ত্র প্রণয়নের লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ভারতে পাঠান, যা ‘মন্ত্রিমিশন’ নামে পরিচিত। এই মিশনের লক্ষ্য ছিল ভারতের অখণ্ডতা রক্ষা করে একটি ফেডারেল কাঠামোর মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এতে সম্মতি জানালেও শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থ হয়।
​ব্যর্থতার প্রধান কারণসমূহ

​১. রাষ্ট্রের কাঠামো নিয়ে মতবিরোধ:
মন্ত্রিমিশন প্রস্তাব করেছিল ভারত হবে একটি ইউনিয়ন, যেখানে প্রদেশগুলো তিনটি গ্রুপে (A, B, C) বিভক্ত থাকবে। কংগ্রেস ভারতের অখণ্ডতা ও একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে ছিল, অন্যদিকে মুসলিম লীগ প্রদেশগুলোর গ্রুপ পদ্ধতিকে পাকিস্তান সৃষ্টির ধাপ হিসেবে দেখে এর ওপর বিশেষ জোর দেয়। এই বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গিই ব্যর্থতার মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

​২. জওহরলাল নেহরুর বক্তব্য:
১৯৪৬ সালের ১০ জুলাই কংগ্রেস সভাপতি জওহরলাল নেহরু এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেন যে, কংগ্রেস কেবল গণপরিষদে যোগ দিতে রাজি হয়েছে এবং তারা প্রয়োজনে মন্ত্রিমিশনের ‘গ্রুপিং’ পদ্ধতি পরিবর্তন করতে পারে। তাঁর এই বক্তব্য মুসলিম লীগের মনে চরম ভীতির সৃষ্টি করে এবং তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে কংগ্রেস ভবিষ্যতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে মুসলিম স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করবে।

​৩. পাকিস্তান সৃষ্টির দাবি উপেক্ষা:
মুসলিম লীগ শুরু থেকেই লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবিতে অটল ছিল। মন্ত্রিমিশন পরিকল্পনায় সরাসরি পাকিস্তান সৃষ্টির কথা উল্লেখ না থাকায় এবং প্রদেশগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু নিয়ন্ত্রণ থাকায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ শেষ পর্যন্ত তাঁর সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন।

​৪. অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা:
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে মুসলিম লীগের সদস্য সংখ্যা এবং তাদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে কংগ্রেস ও ব্রিটিশ সরকারের সাথে লীগের বিরোধ দেখা দেয়। জিন্নাহ মনে করেছিলেন যে ভাইসরয় কংগ্রেসকে বেশি সুবিধা দিচ্ছেন, যা তিক্ততা বাড়িয়ে দেয়।

​৫. পারস্পরিক অবিশ্বাস ও প্রত্যক্ষ সংগ্রাম:
রাজনৈতিক সমঝোতা ব্যর্থ হওয়ায় মুসলিম লীগ ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ (Direct Action Day) পালন করে। এর ফলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়, যা রাজনৈতিক আলোচনার পরিবেশ পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়।

​উপসংহার
​পরিশেষে বলা যায়, মন্ত্রিমিশন পরিকল্পনা ছিল অখণ্ড ভারতকে রক্ষার শেষ ব্রিটিশ প্রচেষ্টা। কিন্তু কংগ্রেসের শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনের আকাঙ্ক্ষা এবং মুসলিম লীগের স্বতন্ত্র আবাসভূমির দাবির মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য না থাকায় এই পরিকল্পনা মুখ থুবড়ে পড়ে। এই ব্যর্থতার পরই ব্রিটিশরা নিশ্চিত হয় যে, ভারতকে ভাগ করা ছাড়া ক্ষমতা হস্তান্তরের আর কোনো বিকল্প পথ নেই, যা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পথ প্রশস্ত করে।