ক্রীপস মিশন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার কী?

​ভূমিকা
​উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে শাসনতান্ত্রিক সংকট নিরসনে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে ব্রিটিশ সরকার ভারতে যে প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিল তা ‘ক্রিপস মিশন’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে, স্বাধীন বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে যে নির্দলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল তা-ই হলো ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’।

​১. ক্রিপস মিশন (Cripps Mission)
​১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি বাহিনীর ভারত আক্রমণের হুমকির মুখে ভারতীয়দের সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসকে ভারতে পাঠান।
​মূল প্রস্তাবসমূহ: ক্রিপস মিশন প্রস্তাব করেছিল যে যুদ্ধ শেষে ভারতকে ‘ডোমিনিয়ন’ স্ট্যাটাস বা স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে এবং ভারতীয়দের নিয়ে একটি সংবিধান প্রণয়নকারী পরিষদ গঠন করা হবে।

​ব্যর্থতার কারণ: এই মিশন সরাসরি পূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলেনি। কংগ্রেস এটি প্রত্যাখ্যান করে কারণ তারা অবিলম্বে পূর্ণ স্বাধীনতা চেয়েছিল। মুসলিম লীগও এটি প্রত্যাখ্যান করে কারণ এতে আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল না। মহাত্মা গান্ধী একে “A post-dated cheque on a crashing bank” (দেউলিয়া হতে চলা ব্যাংকের ওপর পরবর্তী তারিখের চেক) বলে অভিহিত করেন।

​২. তত্ত্বাবধায়ক সরকার (Caretaker Government)
​তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলো একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা, যা একটি নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষে নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে পরবর্তী সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রের রুটিন কাজ পরিচালনা করে।

​লক্ষ্য: এই সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা।
​বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে এটি প্রবর্তন করা হয়। এই ব্যবস্থায় প্রধান উপদেষ্টা (সাধারণত অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি) এবং ১০ জন উপদেষ্টার সমন্বয়ে একটি নির্দলীয় সরকার গঠিত হতো।
​বিলুপ্তি: ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রেক্ষিতে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

​উপসংহার
​পরিশেষে বলা যায়, ক্রিপস মিশন ছিল ব্রিটিশদের একটি কূটনৈতিক চাল যা ভারতীয়দের সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছিল। অন্যদিকে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক সময় অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল, যা দেশে গণতন্ত্রের ধারা সচল রাখতে সহায়তা করেছিল। উভয় ব্যবস্থাপনাই নিজ নিজ সময়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা হিসেবে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।