ভূমিকা
রাষ্ট্রদর্শনের ইতিহাসে থমাস হবস একজন বস্তুবাদী ও যুক্তিবাদী চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিত। তিনি মানুষের প্রকৃতি এবং ‘প্রাকৃতিক রাজ্য’ (State of Nature) বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক আইনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। হবসের মতে, প্রাকৃতিক আইন হলো যুক্তির এমন একটি নির্দেশিকা যা মানুষকে নিজের জীবন রক্ষা করতে এবং ধ্বংসাত্মক পথ পরিহার করতে সহায়তা করে।
প্রাকৃতিক আইনের সংজ্ঞা
হবসের মতে, প্রাকৃতিক আইন (Lex Naturalis) হলো “যুক্তির দ্বারা খুঁজে পাওয়া একটি সাধারণ নিয়ম”। এটি মানুষের বিবেক বা নৈতিকতার চেয়ে বেশি কাজ করে আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে। তিনি ‘প্রাকৃতিক অধিকার’ (Right of Nature) এবং ‘প্রাকৃতিক আইন’ (Law of Nature)-এর মধ্যে পার্থক্য করেছেন। তার মতে:
প্রাকৃতিক অধিকার: নিজের জীবন রক্ষার জন্য যেকোনো কিছু করার স্বাধীনতা।
প্রাকৃতিক আইন: যা মানুষকে নিজের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করে।
হবসের প্রধান তিনটি প্রাকৃতিক আইন
হবস মোট ১৯টি প্রাকৃতিক আইনের কথা উল্লেখ করেছেন, তবে প্রথম তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
শান্তি অন্বেষণ করা: প্রতিটি মানুষের উচিত শান্তির চেষ্টা করা, যতক্ষণ তা পাওয়ার আশা থাকে। যদি শান্তি পাওয়া সম্ভব না হয়, তবে যুদ্ধের মাধ্যমে আত্মরক্ষা করা।
অধিকার ত্যাগ করা: শান্তির স্বার্থে এবং আত্মরক্ষার প্রয়োজনে মানুষ তার প্রাকৃতিক অধিকার বা সীমাহীন স্বাধীনতা ত্যাগ করতে রাজি হবে, যদি অন্যরাও তা করতে সম্মত থাকে।
চুক্তি পালন করা: মানুষ যখন পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে অধিকার ত্যাগ করে, তখন সেই চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি অবশ্যই পালন করতে হবে। হবস মনে করেন, এই আইনটিই হলো ‘ন্যায়বিচার’-এর উৎস।
প্রাকৃতিক আইনের বৈশিষ্ট্য
আত্মরক্ষণশীলতা: হবসের প্রাকৃতিক আইনের মূল ভিত্তি হলো নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা।
যুক্তিভিত্তিক: এটি কোনো আধ্যাত্মিক বিষয় নয়, বরং মানুষের ঠান্ডা মাথার যুক্তি (Reason)।
অপরিবর্তনীয়: হবস মনে করতেন এই আইনগুলো চিরন্তন এবং অপরিবর্তনীয়।
শক্তির অভাব: প্রাকৃতিক আইন মানুষের বিবেককে তাড়িত করলেও, সমাজ বা রাষ্ট্রের শক্তির সাহায্য ছাড়া এটি কার্যকর হয় না। হবস বলেছিলেন, “তলোয়ারহীন চুক্তি কেবল শব্দ মাত্র” (Covenants without the sword are but words)।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, হবসের প্রাকৃতিক আইনের মূল লক্ষ্য ছিল একটি স্থিতিশীল সমাজ ও শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করা। তিনি মনে করতেন, মানুষ যদি এই প্রাকৃতিক আইনগুলো মেনে চলে তবেই ‘প্রাকৃতিক রাজ্যের’ নৈরাজ্য ও যুদ্ধাবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। যদিও সমালোচকরা তাকে চরম স্বৈরতন্ত্রের সমর্থক মনে করেন, কিন্তু তার প্রাকৃতিক আইনের ধারণাটি মূলত মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।


