ভূমিকা
সেন্ট থমাস একুইনাস তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সুমা থিওলজিকা’ (Summa Theologica)-তে আইনের বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, আইন হলো সাধারণ কল্যাণের জন্য প্রণীত যুক্তিনির্ভর এমন এক নির্দেশ বা ব্যবস্থা, যা সেই ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ দ্বারা ঘোষিত হয় যার ওপর সমাজের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ন্যস্ত। তিনি আইনকে কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি, বরং একে স্বর্গীয় যুক্তির প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
একুইনাসের মতে প্রাকৃতিক আইন (Natural Law)
একুইনাস মনে করেন, প্রাকৃতিক আইন হলো মানুষের মধ্যে ‘শাশ্বত আইনের’ (Eternal Law) সেই প্রতিফলন যা মানুষের যুক্তি দ্বারা বোধগম্য।
যুক্তি ও প্রকৃতি: মানুষ বুদ্ধিমান জীব হিসেবে বিশ্বজনীন ব্যবস্থার যে অংশটুকু নিজের যুক্তির মাধ্যমে বুঝতে পারে, তাই প্রাকৃতিক আইন।
অপরিবর্তনীয়তা: এই আইন স্থান-কাল-পাত্রভেদে অপরিবর্তনীয়। এটি মূলত মানুষের ভালো করার এবং মন্দ বর্জন করার প্রবৃত্তি থেকে উদ্ভূত।
নৈতিক ভিত্তি: প্রাকৃতিক আইন মানুষকে সত্যের সন্ধান করতে, সমাজে মিলেমিশে থাকতে এবং অন্যের ক্ষতি না করতে উদ্বুদ্ধ করে। এটি নৈতিকতা ও আইনের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে।
আইনের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Law)
একুইনাস আইনকে প্রধানত ৪টি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। তার এই শ্রেণিবিন্যাস একটি উচ্চক্রম বা পিরামিড সদৃশ কাঠামো অনুসরণ করে:
১. শাশ্বত আইন (Eternal Law)
এটি স্রষ্টার সেই পরিকল্পনা যা দিয়ে সমগ্র মহাবিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে। এই আইন মানুষের বুদ্ধির অগম্য, তবে এর প্রভাব সর্বত্র বিদ্যমান। পৃথিবীর সমস্ত জড় ও জীবজগৎ এই আইনের অনুসারী।
২. প্রাকৃতিক আইন (Natural Law)
শাশ্বত আইনের যে অংশটুকু মানুষ তার বিবেক বা যুক্তির মাধ্যমে বুঝতে পারে, তাকেই প্রাকৃতিক আইন বলে। এটি মানুষকে ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে শেখায়।
৩. দৈব আইন (Divine Law)
এটি হলো সেই আইন যা পবিত্র ধর্মগ্রন্থের (যেমন: বাইবেল) মাধ্যমে মানুষের কাছে প্রকাশিত হয়েছে। একুইনাসের মতে, মানুষের যুক্তির সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্য এবং আত্মার মুক্তির পথ দেখানোর জন্য স্রষ্টা এই আইন প্রদান করেছেন।
৪. মানবিক আইন (Human Law) / ইতিবাচক আইন
মানুষ সমাজ পরিচালনার জন্য প্রাকৃতিক আইনের ওপর ভিত্তি করে যে আইন তৈরি করে, তাই মানবিক আইন। এর বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
এটি প্রাকৃতিক আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
এটি ভঙ্গ করলে শাস্তির বিধান থাকে।
যদি কোনো মানবিক আইন প্রাকৃতিক আইনের পরিপন্থী হয়, তবে একুইনাসের মতে সেটি আইন নয় বরং ‘আইনের বিকৃতি’।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, সেন্ট থমাস একুইনাস আইনকে কেবল পার্থিব শাসনের হাতিয়ার হিসেবে দেখেননি, বরং একে আধ্যাত্মিক ও যুক্তিবাদী কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তার প্রাকৃতিক আইনের ধারণা আধুনিক মানবাধিকার এবং বিচারব্যবস্থার বিবর্তনে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে ‘যুক্তি’ এবং ‘বিশ্বাসের’ মধ্যে তিনি যে সমন্বয় ঘটিয়েছেন, তা রাষ্ট্রদর্শনে এক অবিস্মরণীয় সংযোজন।


