টমাস ম্যালথস এবং জে.বি.সে’র মধ্যে বিতর্কের প্রধান বিষয় কি? কেইন্সীয় কার্যকর চাহিদা ও তারল্য পছন্দ আলোচনা কর।

ভূমিকা

অর্থনীতির ইতিহাসে টমাস রবার্ট ম্যালথস, জে.বি. সে (Jean-Baptiste Say) এবং জন মেনার্ড কেইন্সের তত্ত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ম্যালথস ও সে’র মধ্যে বিতর্ক ছিল অর্থনীতিতে সাধারণ অতিউৎপাদন (General Glut) সম্ভব কি না, তা নিয়ে। পরবর্তীতে কেইন্স এই বিতর্ককে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন এবং কার্যকর চাহিদা (Effective Demand)তারল্য পছন্দ (Liquidity Preference) তত্ত্বের মাধ্যমে দেখান যে, চাহিদার ঘাটতির কারণে বেকারত্ব ও মন্দা সৃষ্টি হতে পারে।

১. টমাস ম্যালথস এবং জে.বি. সে’র মধ্যে বিতর্কের প্রধান বিষয়

ম্যালথস ও জে.বি. সে’র বিতর্কের মূল বিষয় ছিল সাধারণ অতিউৎপাদন এবং বাজারে চাহিদার ভূমিকা

জে.বি. সে’র মতামত (Say’s Law)

জে.বি. সে বলেন—

“Supply creates its own demand.”
অর্থাৎ, উৎপাদন নিজেই তার চাহিদা সৃষ্টি করে।

তার মতে—

  • উৎপাদনের মাধ্যমে মানুষের আয় সৃষ্টি হয়।
  • সেই আয় আবার পণ্য ক্রয়ে ব্যয় হয়।
  • তাই অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ অতিউৎপাদন বা চাহিদার ঘাটতি হতে পারে না।
  • বাজার নিজে থেকেই ভারসাম্যে ফিরে আসে।

ম্যালথসের মতামত

ম্যালথস সে’র এই মতের বিরোধিতা করেন।

তার মতে—

  • মানুষের আয়ের একটি অংশ সঞ্চিত হতে পারে এবং তা সবসময় বিনিয়োগে রূপান্তরিত নাও হতে পারে।
  • ফলে বাজারে মোট চাহিদা কমে যেতে পারে।
  • চাহিদার অভাবে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি না হলে সাধারণ অতিউৎপাদন সৃষ্টি হয়।
  • এতে উৎপাদন কমে যায় এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পায়।
  • তাই অর্থনীতিতে কার্যকর চাহিদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিতর্কের সারমর্ম

ম্যালথসের মতে চাহিদার ঘাটতি অর্থনৈতিক মন্দার কারণ, আর জে.বি. সে’র মতে বাজারে এমন ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে থাকতে পারে না। পরবর্তীতে কেইন্স ম্যালথসের মতামতকে অধিক সমর্থন করেন।


২. কেইন্সীয় কার্যকর চাহিদা (Effective Demand)

সংজ্ঞা

কার্যকর চাহিদা হলো এমন চাহিদা, যা ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা দ্বারা সমর্থিত এবং যার ভিত্তিতে উদ্যোক্তারা উৎপাদনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

বৈশিষ্ট্য

  • এটি মোট চাহিদা ও মোট যোগানের সমতার বিন্দুতে নির্ধারিত হয়।
  • কর্মসংস্থানের মাত্রা কার্যকর চাহিদার ওপর নির্ভরশীল।
  • কার্যকর চাহিদা বৃদ্ধি পেলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়।
  • কার্যকর চাহিদা কমে গেলে বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়।

কার্যকর চাহিদার উপাদান

১. ভোগ ব্যয় (Consumption Expenditure)
২. বিনিয়োগ ব্যয় (Investment Expenditure)

গুরুত্ব

  • পূর্ণ কর্মসংস্থান অর্জনে সহায়ক।
  • অর্থনৈতিক মন্দা ব্যাখ্যা করে।
  • সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা প্রদান করে।
  • আধুনিক সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।

৩. কেইন্সীয় তারল্য পছন্দ (Liquidity Preference)

সংজ্ঞা

তারল্য পছন্দ হলো মানুষের এমন প্রবণতা, যেখানে তারা সম্পদকে নগদ অর্থ বা সহজে ব্যবহারযোগ্য অর্থের আকারে রাখতে চায়।

অর্থ ধারণের উদ্দেশ্য

কেইন্স মানুষের অর্থ রাখার তিনটি উদ্দেশ্য উল্লেখ করেন—

১. লেনদেনের উদ্দেশ্য (Transaction Motive)

  • দৈনন্দিন কেনাবেচা ও ব্যয়ের জন্য অর্থ রাখা।

২. সতর্কতামূলক উদ্দেশ্য (Precautionary Motive)

  • হঠাৎ প্রয়োজন বা জরুরি পরিস্থিতির জন্য অর্থ রাখা।

৩. ফাটকাবাজি বা জল্পনা উদ্দেশ্য (Speculative Motive)

  • ভবিষ্যতে সুদের হার পরিবর্তনের সুযোগ গ্রহণের জন্য নগদ অর্থ রাখা।

তারল্য পছন্দ ও সুদের হার

  • মানুষ যত বেশি নগদ অর্থ রাখতে চাইবে, সুদের হার তত বেশি হওয়ার প্রবণতা থাকবে।
  • আবার সুদের হার কম হলে মানুষ ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়বে বলে নগদ অর্থ ধরে রাখতে আগ্রহী হয়।
  • তাই কেইন্সের মতে সুদের হার নির্ধারিত হয় অর্থের চাহিদা (তারল্য পছন্দ) এবং অর্থের যোগানের মাধ্যমে।

গুরুত্ব

  • সুদের হার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  • বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে প্রভাবিত করে।
  • মুদ্রানীতি পরিচালনায় সহায়ক।
  • অর্থনৈতিক মন্দা বিশ্লেষণে কার্যকর।

উপসংহার

ম্যালথস ও জে.বি. সে’র বিতর্ক অর্থনীতিতে চাহিদার গুরুত্বকে সামনে নিয়ে আসে। জে.বি. সে বিশ্বাস করতেন যে উৎপাদন নিজেই চাহিদা সৃষ্টি করে, কিন্তু ম্যালথস মনে করতেন চাহিদার ঘাটতি থেকেই অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে। পরবর্তীতে কেইন্স কার্যকর চাহিদা ও তারল্য পছন্দ তত্ত্বের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে চাহিদার অভাব, বিনিয়োগের ঘাটতি এবং অর্থ ধারণের প্রবণতা অর্থনীতিতে বেকারত্ব ও মন্দার প্রধান কারণ হতে পারে। তাই আধুনিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে কেইন্সের তত্ত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।