ভূমিকা:
অর্থনীতির ইতিহাসে “কেইন্সীয় বিপ্লব” (Keynesian Revolution) একটি যুগান্তকারী ঘটনা। দীর্ঘদিন ধরে ধ্রুপদী অর্থনীতিবিদরা বিশ্বাস করতেন যে বাজারব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ণ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সক্ষম। কিন্তু ১৯২৯ সালের মহামন্দা (Great Depression) সেই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই সংকটের প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ John Maynard Keynes নতুন অর্থনৈতিক চিন্তাধারার সূচনা করেন, যা পরবর্তীতে “কেইন্সীয় বিপ্লব” নামে পরিচিত হয়।
কেইন্সীয় বিপ্লবের ঐতিহাসিক পটভূমি
১. ধ্রুপদী অর্থনীতির আধিপত্য:
উনবিংশ শতাব্দী ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত ধ্রুপদী অর্থনীতি অর্থনৈতিক চিন্তার মূলধারা ছিল। তারা বিশ্বাস করতেন যে বাজারে চাহিদা ও যোগানের সমন্বয়ের মাধ্যমে অর্থনীতি নিজেই ভারসাম্যে ফিরে আসে এবং পূর্ণ কর্মসংস্থান প্রতিষ্ঠিত হয়।
২. সের সূত্রের (Say’s Law) সীমাবদ্ধতা:
ধ্রুপদী অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল সের সূত্র—”যোগান নিজেই তার চাহিদা সৃষ্টি করে।” কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, উৎপাদিত সব পণ্য বিক্রি হয় না এবং সামগ্রিক চাহিদার ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে বেকারত্ব ও মন্দা সৃষ্টি হয়, যা সের সূত্র ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়।
৩. ১৯২৯ সালের মহামন্দা (Great Depression):
১৯২৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার ধসের মাধ্যমে শুরু হওয়া মহামন্দা দ্রুত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। শিল্প উৎপাদন কমে যায়, অসংখ্য ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয় এবং কোটি কোটি মানুষ বেকার হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে ধ্রুপদী অর্থনীতির নীতিগুলো কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি।
৪. ব্যাপক বেকারত্বের উদ্ভব:
মহামন্দার সময় দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক বেকারত্ব সৃষ্টি হয়। মজুরি কমলেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়নি। এতে প্রমাণিত হয় যে শুধুমাত্র বাজারের ওপর নির্ভর করলে অর্থনীতি সবসময় পূর্ণ কর্মসংস্থানে পৌঁছাতে পারে না।
৫. কার্যকর চাহিদার অভাব:
কেইন্স দেখান যে অর্থনৈতিক মন্দার প্রধান কারণ হলো কার্যকর চাহিদার (Effective Demand) ঘাটতি। মানুষ ও ব্যবসায়ীরা যখন ব্যয় ও বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়, তখন উৎপাদন ও কর্মসংস্থান উভয়ই হ্রাস পায়।
৬. সরকারের সক্রিয় ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা:
ধ্রুপদী অর্থনীতি সীমিত সরকারি হস্তক্ষেপের পক্ষে থাকলেও কেইন্স যুক্তি দেন যে অর্থনৈতিক মন্দা দূর করতে সরকারকে রাজস্বনীতি (Fiscal Policy) ও সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি করে সামষ্টিক চাহিদা বাড়াতে হবে। এর মাধ্যমে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি সম্ভব।
৭. ‘The General Theory’ গ্রন্থের প্রকাশ (১৯৩৬):
১৯৩৬ সালে কেইন্স তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The General Theory of Employment, Interest and Money প্রকাশ করেন। এই গ্রন্থে তিনি কার্যকর চাহিদা, বিনিয়োগ, সুদের হার, ভোগ এবং সরকারি ব্যয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন। এই গ্রন্থই কেইন্সীয় বিপ্লবের ভিত্তি স্থাপন করে।
৮. অর্থনৈতিক নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন:
কেইন্সের তত্ত্ব গ্রহণের পর বিশ্বের বহু দেশ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং মন্দা মোকাবিলার জন্য সরকারি ব্যয় ও সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি গ্রহণ করে। ফলে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে একটি নতুন যুগের সূচনা হয়।
উপসংহার
কেইন্সীয় বিপ্লবের ঐতিহাসিক পটভূমি মূলত ১৯২৯ সালের মহামন্দা, ধ্রুপদী অর্থনীতির সীমাবদ্ধতা এবং কার্যকর চাহিদার ঘাটতির বাস্তব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। কেইন্স প্রমাণ করেন যে বাজারব্যবস্থা সবসময় নিজে থেকে ভারসাম্যে পৌঁছাতে পারে না এবং প্রয়োজনে সরকারের সক্রিয় হস্তক্ষেপ অপরিহার্য। তাই কেইন্সীয় বিপ্লব শুধু অর্থনৈতিক তত্ত্বেই নয়, আধুনিক রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণেও এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেছে।


