ভূমিকা
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ভারতের রাজনৈতিক দিগন্তে এক নতুন চেতনার উদয় ঘটে। দীর্ঘদিনের ব্রিটিশ শাসন, অর্থনৈতিক শোষণ এবং পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ভারতীয়দের মধ্যে একতাবদ্ধ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে। এই আকাঙ্ক্ষারই চূড়ান্ত রূপ ছিল ১৮৮৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর বোম্বাইয়ের (বর্তমান মুম্বাই) গোকুলদাস তেজপাল সংস্কৃত কলেজে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা। এর প্রথম সভাপতি ছিলেন উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রতিষ্ঠার পটভূমি
কংগ্রেস কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এর পিছনে ছিল গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণ:
- আঞ্চলিক সংগঠনের সীমাবদ্ধতা: কংগ্রেসের আগে ‘পুনা সর্বজনিক সভা’, ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’ বা ‘মাদ্রাজ মহাজন সভা’র মতো সংগঠনগুলো সক্রিয় ছিল। কিন্তু এগুলোর প্রভাব ছিল আঞ্চলিক। একটি সর্বভারতীয় মঞ্চের অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছিল।
- লর্ড লিটনের প্রতিক্রিয়াশীল নীতি: ভাইসরয় লর্ড লিটনের কিছু পদক্ষেপ (যেমন: দেশীয় সংবাদপত্র দমন আইন বা ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট, অস্ত্র আইন এবং সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বয়স কমানো) ভারতীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
- ইলবার্ট বিল বিতর্ক: ভারতীয় বিচারকদের শ্বেতাঙ্গদের বিচার করার অধিকার দেওয়া নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়, তা ভারতীয়দের বুঝিয়ে দেয় যে সংগঠিত না হলে ব্রিটিশদের কাছ থেকে কোনো অধিকার আদায় সম্ভব নয়।
- অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউমের ভূমিকা: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ রাজকর্মচারী এ.ও. হিউম ব্রিটিশ সরকারের ওপর ভারতীয়দের ক্ষোভ প্রশমিত করতে এবং একটি “নিরাপদ বহির্গমন পথ” (Safety Valve) হিসেবে একটি রাজনৈতিক সংগঠন তৈরির উদ্যোগ নেন।
ভারতের রাজনীতিতে প্রভাব
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে:
১. জাতীয়তাবাদের বিকাশ
কংগ্রেসই প্রথম ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের, ধর্মের এবং ভাষার মানুষকে একটি সাধারণ রাজনৈতিক লক্ষ্যের অধীনে নিয়ে আসে। এটি আঞ্চলিক পরিচয় ছাপিয়ে “ভারতীয়” পরিচয় গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
২. রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি
কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনগুলোতে ভারতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা হতো। এর ফলে সাধারণ মানুষ ব্রিটিশ শাসনের শোষণমূলক চরিত্র (যেমন—দাদাভাই নওরোজির ‘সম্পদ নির্গমন তত্ত্ব’) সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে।
৩. সাংবিধানিক সংস্কারের দাবি
শুরুর দিকে কংগ্রেস ‘নরমপন্থী’ নীতি অনুসরণ করলেও, তারা আইনসভায় ভারতীয় প্রতিনিধি সংখ্যা বাড়ানো এবং প্রশাসনিক সংস্কারের জন্য সরকারকে চাপ দিতে থাকে। এর ফলে পরবর্তীতে ১৮৯২ সালের ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্ট’ পাস হয়।
৪. গণ-আন্দোলনের ভিত্তিপ্রস্তর
পরবর্তীতে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস একটি গণ-সংগঠনে পরিণত হয়। অসহযোগ, আইন অমান্য এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মতো বড় বড় সংগ্রাম এই কংগ্রেসের পতাকাতলে থেকেই পরিচালিত হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত ভারতকে স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যায়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হয়তো সীমিত ছিল, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল অপরিসীম। এটি ভারতীয়দের মনে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে এবং একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক সংগ্রামের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। কংগ্রেসের মাধ্যমেই ভারত তার হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি অখণ্ড রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর খুঁজে পায়, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।


