অসহযোগ আন্দোলনের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর।

ভূমিকা

১৯২০ সালে কলকাতায় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে মহাত্মা গান্ধীর ‘অসহযোগ’ প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার মধ্য দিয়ে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। এটি ছিল মূলত ব্রিটিশ সরকারের অন্যায় ও দমনমূলক নীতির বিরুদ্ধে ভারতীয় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত এবং অহিংস প্রতিবাদ। হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণ এই আন্দোলনকে একটি শক্তিশালী রূপ দিয়েছিল।


অসহযোগ আন্দোলনের কারণসমূহ

এই আন্দোলনের পেছনে বেশ কিছু পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও ঐতিহাসিক ঘটনা কাজ করেছিল:

  • ১. রাওলাট আইনের প্রতিক্রিয়া: ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ সরকার ‘রাওলাট আইন’ পাস করে, যার মাধ্যমে বিনা বিচারে ভারতীয়দের কারারুদ্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। একে ভারতীয়রা ‘কালা কানুন’ বলে অভিহিত করে এবং এর প্রতিবাদে জনরোষ তৈরি হয়।
  • ২. জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড: রাওলাট আইনের প্রতিবাদে অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে সমবেত নিরপরাধ মানুষের ওপর জেনারেল ডায়ার নৃশংস গুলি চালালে শত শত মানুষ নিহত হন। এই বর্বরোচিত ঘটনা গান্ধীজিকে ব্রিটিশদের প্রতি সম্পূর্ণ বিমুখ করে তোলে।
  • ৩. খিলাফত আন্দোলন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্কের খলিফার অমর্যাদাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় মুসলিম সমাজ ক্ষুব্ধ ছিল। গান্ধীজি এই ক্ষোভকে ব্রিটিশবিরোধী মূল ধারার সাথে যুক্ত করে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সুযোগ হিসেবে দেখেন।
  • ৪. অর্থনৈতিক মন্দা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, উচ্চ কর এবং দুর্ভিক্ষ সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল, যা গণ-অসন্তোষের সৃষ্টি করে।

আন্দোলনের কর্মসূচী

অসহযোগ আন্দোলন মূলত দুটি ধারায় পরিচালিত হয়েছিল:

  1. বর্জনমূলক: সরকারি খেতাব ও পদক ত্যাগ, স্কুল-কলেজ বর্জন, আদালত বর্জন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—বিদেশি পণ্য বর্জন
  2. গঠনমূলক: খাদি ও চরকার প্রচার, গ্রাম পঞ্চায়েত গঠন, জাতীয় বিদ্যালয় স্থাপন এবং অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ।

আন্দোলনের ফলাফল ও গুরুত্ব

চৌরিচৌরার সহিংস ঘটনার (১৯২২) পর গান্ধীজি হঠাৎ আন্দোলন প্রত্যাহার করলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য:

  • ১. গণ-আন্দোলনের রূপ: এর আগে ভারতীয় রাজনীতি উচ্চবিত্ত বা শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমেই প্রথম কৃষক, শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত হয়।
  • ২. হিন্দু-মুসলিম ঐক্য: খিলাফত ও অসহযোগের সংমিশ্রণ ভারতীয় রাজনীতিতে এক বিরল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ঐক্যের বাতাবরণ তৈরি করেছিল।
  • ৩. কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি: এই আন্দোলনের ফলে জাতীয় কংগ্রেস একটি শক্তিশালী গণ-সংগঠনে রূপান্তরিত হয়। খাদির ব্যবহার ও স্বদেশি মনোভাব প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।
  • ৪. ব্রিটিশদের মনে ভীতি সঞ্চার: ব্রিটিশরা বুঝতে পারে যে, শুধুমাত্র গায়ের জোরে ভারতীয়দের বেশিদিন দমন করে রাখা সম্ভব নয়। শাসন ব্যবস্থায় ভারতীয়দের অংশগ্রহণ বাড়াতে তারা বাধ্য হয়।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, অসহযোগ আন্দোলন ব্রিটিশদের হাত থেকে তাৎক্ষণিক স্বাধীনতা এনে দিতে না পারলেও ভারতীয়দের মনে ‘নির্ভীকতা’ ও ‘আত্মবিশ্বাস’ জাগ্রত করেছিল। এই আন্দোলনের মাধ্যমেই মহাত্মা গান্ধী ভারতের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন এবং ভবিষ্যতের চূড়ান্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।