হবস্ এর মতে নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব কী?

অথবা, রাষ্ট্রের উৎপত্তি প্রসঙ্গে হবসের ধারণা বর্ণনা কর।

ভূমিকা: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে টমাস হবস্ হলেন সার্বভৌমত্বের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার প্রধান প্রবক্তা। তাঁর মতে, মানুষ যখন প্রাক-রাজনৈতিক ‘প্রকৃতির রাজ্যে’ (State of Nature) হানাহানি ও নিরাপত্তাহীনতায় লিপ্ত ছিল, তখন তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় একটি সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠন করে। এই চুক্তির ফলে সকল ক্ষমতা একজন ব্যক্তি বা ব্যক্তি-সংসদকে অর্পণ করা হয়, যাকে হবস্ ‘সার্বভৌম’ (Sovereign) বলে অভিহিত করেছেন।
হবস্-এর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের বৈশিষ্ট্য
হবস্-এর সার্বভৌমত্বের মূল ভিত্তি হলো এটি কোনো শর্তের অধীন নয়। এর প্রধান দিকগুলো নিম্নরূপ:
১. চুক্তির ঊর্ধ্বে সার্বভৌম:
হবস্-এর মতে, সার্বভৌম শক্তি চুক্তির কোনো পক্ষ নয়; বরং চুক্তির ফল। জনগণ নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে সার্বভৌম শক্তি সৃষ্টি করেছে, কিন্তু সার্বভৌম ব্যক্তি নিজে কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। তাই তিনি চুক্তির কোনো শর্ত মানতে বাধ্য নন এবং তাঁর ক্ষমতা নিরঙ্কুশ।

২. অসীম ও অপ্রতিহত ক্ষমতা:
সার্বভৌম শক্তির ক্ষমতা অসীম। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এমন কোনো কর্তৃপক্ষ নেই যা তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তাঁর আদেশই আইন। তিনি যা সঠিক মনে করবেন, তা-ই আইন হিসেবে গণ্য হবে।

৩. অবিভাজ্যতা:
হবস্ বিশ্বাস করতেন যে সার্বভৌম ক্ষমতাকে ভাগ করা যায় না। ক্ষমতা ভাগ করলে রাষ্ট্রের ঐক্য নষ্ট হয় এবং গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা তৈরি হয়। আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ এবং বিচার বিভাগ—সবই এক ব্যক্তির অধীনে থাকবে।

৪. ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ড:
প্রকৃতির রাজ্যে ন্যায়-অন্যায়ের কোনো ধারণা ছিল না। সার্বভৌম শক্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনিই নির্ধারণ করেন কোনটি ন্যায় আর কোনটি অন্যায়। তাঁর কোনো কাজকেই ‘অন্যায্য’ বা ‘বেআইনি’ বলা যাবে না।

৫. প্রজাদের আনুগত্য ও প্রতিরোধের অধিকার:
হবস্-এর মতে, প্রজাদের একমাত্র কাজ হলো সার্বভৌম শক্তির আদেশ মেনে চলা। একমাত্র জীবন রক্ষার অধিকার বিপন্ন হলে মানুষ সার্বভৌম শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে, নতুবা কোনো অবস্থাতেই বিদ্রোহ করার অধিকার তাদের নেই।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, হবস্-এর সার্বভৌমত্ব হলো এক চরম ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। তিনি মনে করতেন, শক্তিশালী ও অপ্রতিহত কেন্দ্রীয় শক্তি না থাকলে সমাজ আবার সেই বিশৃঙ্খল প্রকৃতির রাজ্যে ফিরে যাবে। যদিও তাঁর এই তত্ত্বকে অনেকে স্বৈরাচারী বলে সমালোচনা করেছেন, তবুও আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সার্বভৌমত্বের আইনগত ভিত্তি বুঝতে হবস্-এর দর্শন আজও অপরিহার্য।