সার্বভৌমত্ব কি? হবসের সার্বভৌমত্ব মতবাদ আলোচনা কর।

ভূমিকা
সার্বভৌমত্ব হলো রাষ্ট্রের সেই চরম ও পরম ক্ষমতা, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখে এবং বাহ্যিক ক্ষেত্রে অন্য কোনো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত থাকে। ল্যাটিন শব্দ ‘Superanus’ থেকে সার্বভৌমত্ব বা Sovereignty শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ ‘সর্বোচ্চ ক্ষমতা’। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জঁ বোঁদা প্রথম সার্বভৌমত্বের ধারণা দিলেও থমাস হবস একে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চরম রূপ দান করেছেন।

সার্বভৌমত্ব: সার্বভৌমত্ব (Sovereignty) হলো একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ, চূড়ান্ত এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। এটি রাষ্ট্রের চারটি মূল উপাদানের (জনসমষ্টি, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্ব) মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সার্বভৌমত্বের কারণেই একটি রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং দেশের অভ্যন্তরে সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর আইনগত প্রাধান্য বজায় রাখতে পারে।

হবসের সার্বভৌমত্ব মতবাদ
থমাস হবসের সার্বভৌমত্ব তত্ত্বটি তার ‘সামাজিক চুক্তি’ (Social Contract) মতবাদের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। তার এই মতবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. চুক্তির মাধ্যমে উদ্ভব
হবসের মতে, আদিম ‘প্রকৃতির রাজ্যে’ (State of Nature) মানুষের জীবন ছিল “একাকী, দরিদ্র, নোংরা, পাশবিক ও স্বল্পস্থায়ী”। এই অরাজকতা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ নিজেদের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে সমস্ত ক্ষমতা একজন ব্যক্তি বা ব্যক্তি-সংসদকে অর্পণ করে। এই ক্ষমতা অর্জনকারী ব্যক্তিই হলেন ‘সার্বভৌম’ শাসক।

২. সার্বভৌম ক্ষমতা চরম ও অসীম
হবসের মতে, সার্বভৌম শাসক কোনো চুক্তির পক্ষ নন; বরং চুক্তির ফল। তাই তিনি চুক্তির কোনো শর্তে আবদ্ধ নন। তার ক্ষমতা চরম (Absolute) এবং তাকে কোনো জাগতিক আইন বা শক্তির মাধ্যমে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়।

৩. সার্বভৌমত্বের অবিভাজ্যতা
হবস বিশ্বাস করতেন যে, সার্বভৌম ক্ষমতাকে ভাগ করা যায় না। যদি এই ক্ষমতাকে বিভিন্ন হাতে ভাগ করে দেওয়া হয়, তবে রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা ও গৃহযুদ্ধ দেখা দেবে। তাই তার মতে, সার্বভৌমত্ব হলো অবিভাজ্য এবং হস্তান্তর অযোগ্য।

৪. আইন ও ন্যায়বিচারের উৎস
হবসের দর্শনে সার্বভৌম শাসকের আদেশই হলো আইন। আইনের ঊর্ধ্বে তিনি নিজেই। তিনি যা ভালো মনে করবেন তা-ই ন্যায়, আর যা তিনি নিষিদ্ধ করবেন তা-ই অন্যায়। সার্বভৌম শাসকের সিদ্ধান্তই হলো চূড়ান্ত বিচার।

৫. নিরঙ্কুশ আনুগত্য
হবসের মতে, প্রজাদের একমাত্র কাজ হলো সার্বভৌম শাসকের আদেশ পালন করা। শাসকের কোনো কাজকেই প্রজারা অন্যায় বা অবৈধ বলতে পারে না। কারণ, প্রজারা স্বেচ্ছায় নিজেদের অধিকার তার হাতে তুলে দিয়েছে। একমাত্র আত্মরক্ষার অধিকার বিপন্ন হলে মানুষ বিদ্রোহ করতে পারে, অন্যথায় নয়।

৬. গির্জা ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক
হবস সার্বভৌম শাসককে ধর্মীয় বিষয়ের ওপরও কর্তৃত্ব দান করেছেন। তার মতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা গির্জা রাষ্ট্রের অধীন থাকবে। সার্বভৌম শাসকই নির্ধারণ করবেন রাষ্ট্রের প্রচলিত ধর্ম ও আচার কী হবে।

হবসের মতবাদের সীমাবদ্ধতা
হবসের সার্বভৌমত্ব মতবাদ যেমন শক্তিশালী, তেমনি এটি সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়:

স্বৈরাচারী শাসন: হবসের সার্বভৌম শাসক অনেকটা স্বেচ্ছাচারী বা স্বৈরাচারী শাসকের মতো, যেখানে জনগণের কোনো মৌলিক অধিকার বা বাকস্বাধীনতা থাকে না।

আইনের নৈতিক ভিত্তি নেই: হবস আইনকে কেবল শাসকের আদেশ হিসেবে দেখেছেন, যা নৈতিকতা বা জনমতের তোয়াক্কা করে না।

চুক্তি একপাক্ষিক: শাসকের ওপর কোনো দায়িত্ব বা বাধ্যবাধকতা না থাকায় এই চুক্তিটি একপাক্ষিক বলে মনে হয়।

উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, থমাস হবস তার সার্বভৌমত্ব তত্ত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। যদিও তার তত্ত্বটি স্বৈরাচারী শাসনের পথ প্রশস্ত করে বলে মনে করা হয়, তবুও তৎকালীন ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনের প্রয়োজনীয়তা থেকেই তিনি এই ধারণা দিয়েছিলেন। আধুনিক রাষ্ট্রের সংজ্ঞায় তার ‘সার্বভৌমত্ব’ ধারণাটি আজও একটি অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত।