ভূমিকা
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটল তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘Politics’-এ তৎকালীন গ্রিসের ১৫৮টি নগররাষ্ট্রের সংবিধান পর্যালোচনা করে সরকারের একটি বিজ্ঞানসম্মত শ্রেণিবিভাগ প্রদান করেছেন। তিনি মূলত দুটি নীতির ওপর ভিত্তি করে এই শ্রেণিবিভাগ করেছেন—প্রথমটি হলো শাসকের ‘সংখ্যা’ এবং দ্বিতীয়টি হলো শাসনের ‘উদ্দেশ্য’। তাঁর মতে, সরকার যখন জনকল্যাণে কাজ করে তখন তা ‘স্বাভাবিক’ এবং যখন শাসকের ব্যক্তিস্বার্থে কাজ করে তখন তা ‘বিকৃত’ সরকার হিসেবে গণ্য হয়।
এরিস্টটলের সরকারের শ্রেণিবিভাগ
এরিস্টটল সরকারকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন এবং প্রতিটির ‘স্বাভাবিক’ ও ‘বিকৃত’ রূপ ব্যাখ্যা করেছেন:
১. একজনের শাসন
রাজতন্ত্র (Monarchy): এটি সরকারের স্বাভাবিক রূপ। যখন একজন ব্যক্তি (রাজা) সমগ্র জনগণের কল্যাণের কথা চিন্তা করে শাসন পরিচালনা করেন, তাকে রাজতন্ত্র বলা হয়। এরিস্টটলের মতে এটিই শ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা।
স্বৈরতন্ত্র (Tyranny): এটি রাজতন্ত্রের বিকৃত রূপ। যখন রাজা জনস্বার্থ ত্যাগ করে নিজের ক্ষমতা ও স্বার্থ রক্ষায় মত্ত হন এবং প্রজাদের ওপর অত্যাচার করেন, তখন তা স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হয়।
২. কয়েকজনের শাসন
অভিজাততন্ত্র (Aristocracy): যখন সমাজের মুষ্টিমেয় কিছু শ্রেষ্ঠ ও গুণী ব্যক্তি জনস্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তখন তাকে অভিজাততন্ত্র বলা হয়। এটি একটি কল্যাণকর শাসনব্যবস্থা।
ধনিকতন্ত্র (Oligarchy): এটি অভিজাততন্ত্রের বিকৃত রূপ। যখন অল্পসংখ্যক শাসক সাধারণ মানুষের কথা ভুলে গিয়ে কেবল নিজেদের ধন-সম্পদ বৃদ্ধি ও রক্ষার জন্য রাষ্ট্র ক্ষমতা ব্যবহার করে, তাকে ধনিকতন্ত্র বলা হয়।
৩. বহুজনের শাসন
পলিটি বা মধ্যতন্ত্র (Polity): এটি বহুজনের শাসনের স্বাভাবিক রূপ। এখানে শাসন ক্ষমতা মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতে থাকে। এরিস্টটল একে ‘সর্বোত্তম সম্ভাব্য সরকার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন কারণ এটি সমাজের সকল শ্রেণির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে।
গণতন্ত্র (Democracy): আধুনিক অর্থে আমরা গণতন্ত্রকে ভালো মনে করলেও এরিস্টটলের কাছে এটি ছিল একটি বিকৃত রূপ। তাঁর মতে, যখন শাসনের নামে অযোগ্য ও দরিদ্র সংখ্যাগুরুরা ধনীদের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয় এবং অরাজকতা সৃষ্টি করে, তখন তাকে তিনি গণতন্ত্র (বা ভিড়ের শাসন) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
সরকারের পরিবর্তন চক্র
এরিস্টটল পর্যবেক্ষণ করেছেন যে কোনো সরকারই চিরস্থায়ী নয়। তিনি একে ‘চক্রাকার পরিবর্তন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। রাজতন্ত্র বিকৃত হয়ে স্বৈরতন্ত্রে পরিণত হয়; স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা অভিজাততন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। আবার অভিজাততন্ত্রের অবনতি ঘটলে ধনিকতন্ত্র আসে, যার ফলে সাধারণ মানুষ বিদ্রোহ করে ‘পলিটি’ বা মধ্যতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। পলিটি যখন অযোগ্যদের হাতে পড়ে তখন তা গণতন্ত্রে পরিণত হয় এবং শেষ পর্যন্ত চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে আবারও একজন শক্তিশালী বীরের উত্থান ঘটে এবং রাজতন্ত্র পুনরায় ফিরে আসে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, এরিস্টটলের সরকারের শ্রেণিবিভাগ অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ এবং পর্যবেক্ষণমূলক। যদিও তাঁর ‘গণতন্ত্র’ সংক্রান্ত ধারণা বর্তমান যুগের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তবুও শাসকের সংখ্যা ও উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে তাঁর এই বিভাজন আজও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় মৌল ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত। তিনি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, শাসনের আদর্শ রূপটি তখনই বজায় থাকে যখন শাসক নিজের স্বার্থের চেয়ে জনগণের কল্যাণকে বড় করে দেখেন।


