ভূমিকা
ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতি মূল্যায়নের জন্য সমচ্ছেদ বিন্দু একটি অত্যন্ত কার্যকারী নির্দেশক। সমচ্ছেদ বিন্দু হলো বিক্রয়ের এমন একটি স্তর বা পরিমাণ, যেখানে প্রতিষ্ঠানের মোট আয় এবং মোট ব্যয় সমান হয়। অর্থাৎ, এই বিন্দুতে প্রতিষ্ঠানের কোনো লাভও হয় না, আবার কোনো ক্ষতিও হয় না। এই বিন্দুর উপরের স্তরে প্রতিষ্ঠান মুনাফা অর্জন করে এবং নিচের স্তরে লোকসান বা ক্ষতির সম্মুখীন হয়। একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বা বিক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং সঠিক মূল্য নির্ধারণ কৌশলে সমচ্ছেদ বিন্দু নির্ণয় করা অপরিহার্য।
সমচ্ছেদ বিন্দু নির্ণয়ের পদ্ধতি বা প্রক্রিয়াসমূহ
সমচ্ছেদ বিন্দু মূলত তিনটি প্রধান বর্ণনামূলক ও বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতির সাহায্যে নির্ণয় করা যায়। পদ্ধতিগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. সমীকরণ প্রক্রিয়া (বর্ণনামূলক বিশ্লেষণ)
এটি সমচ্ছেদ বিন্দু নির্ণয়ের সবচেয়ে মৌলিক ও যুক্তিভিত্তিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানের মোট বিক্রয়লব্ধ আয় এবং মোট খরচের মধ্যে সমতা খোঁজা হয়।
প্রক্রিয়া: প্রতিষ্ঠানের মোট খরচকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়—স্থায়ী খরচ (যা উৎপাদন বাড়লে বা কমলে বদলায় না, যেমন কারখানার ভাড়া) এবং পরিবর্তনশীল খরচ (যা উৎপাদনের পরিমাণের সাথে বাড়ে বা কমে, যেমন কাঁচামাল খরচ)।
যখন কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য বিক্রয়ের মাধ্যমে অর্জিত মোট টাকা, সেই পণ্যের পেছনে হওয়া মোট স্থায়ী ও পরিবর্তনশীল খরচের সমান হয়, তখন সেই বিক্রয়ের পরিমাণকে সমচ্ছেদ বিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
২. অনুদান প্রান্ত বা কন্ট্রিবিউশন মার্জিন প্রক্রিয়া
এই প্রক্রিয়াটি ব্যবসায়ের একক প্রতি খরচ এবং আয়ের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে।
একক প্রতি অনুদান প্রান্ত: একটি পণ্য যে মূল্যে বিক্রয় করা হয়, তা থেকে ওই পণ্যটি তৈরি করার পরিবর্তনশীল খরচটুকু বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থাকে, তাকে অনুদান প্রান্ত বা কন্ট্রিবিউশন মার্জিন বলা হয়। এই অবশিষ্ট টাকাই মূলত ব্যবসায়ের স্থায়ী খরচ মেটাতে সাহায্য করে।
বিন্দু নির্ধারণ: পণ্য বিক্রয়ের মাধ্যমে এই অনুদান প্রান্ত জমতে জমতে যখন তা প্রতিষ্ঠানের মোট স্থায়ী খরচের সমান হয়ে যায়, ঠিক তখনই সমচ্ছেদ বিন্দু অর্জিত হয়। কারণ স্থায়ী খরচ পুরোপুরি উঠে আসার পর প্রতিষ্ঠানে আর কোনো ক্ষতি থাকে না, আবার বাড়তি মুনাফাও তৈরি হয় না।
৩. রৈখিক বা গ্রাফিক্যাল প্রক্রিয়া (চিত্রভিত্তিক বিশ্লেষণ)
যখন কাগজের পাতায় রেখাচিত্র বা গ্রাফের সাহায্যে জ্যামিতিক উপায়ে সমচ্ছেদ বিন্দু ফুটিয়ে তোলা হয়, তখন তাকে গ্রাফিক্যাল প্রক্রিয়া বলা হয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থাপকগণ খুব সহজেই ব্যবসায়ের সামগ্রিক চিত্র একনজরে দেখতে পান।
অঙ্কন প্রক্রিয়া: গ্রাফের নিচের সমান্তরাল লাইনে উৎপাদনের পরিমাণ বা একক এবং খাড়া লাইনে টাকা (আয় ও ব্যয়) ধরা হয়।
প্রথমে একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় সোজা করে স্থায়ী ব্যয় রেখা টানা হয়, কারণ উৎপাদন শূন্য হলেও এই খরচ দিতেই হয়। এরপর সেই স্থায়ী ব্যয়ের বিন্দু থেকে উপরের দিকে ডানপাশে মোট ব্যয় রেখা টানা হয়। সবশেষে একদম শূন্য বিন্দু থেকে শুরু করে উপরের দিকে ডানপাশে মোট বিক্রয় রেখা টানা হয়।
বিন্দু নির্ধারণ: গ্রাফের পাতায় মোট বিক্রয় রেখা এবং মোট ব্যয় রেখা একে অপরকে যে নির্দিষ্ট বিন্দুতে আড়াআড়িভাবে কেটে যায় বা ছেদ করে, সেটাই হলো সমচ্ছেদ বিন্দু।
চিত্রের ব্যাখ্যা: এই ছেদ বিন্দুর নিচের ফাঁকা অংশটি ব্যবসায়ের ক্ষতির এলাকা এবং বিন্দুর উপরের ফাঁকা অংশটি ব্যবসায়ের মুনাফার এলাকা নির্দেশ করে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, সমচ্ছেদ বিন্দু নির্ণয় করা যেকোনো উৎপাদনকারী বা ব্যবসায়ি প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি নিখুঁত গাইডলাইন হিসেবে কাজ করে। গাণিতিক জটিলতা ছাড়াই কেবল আয়ের সাথে স্থায়ী ও পরিবর্তনশীল খরচের সমন্বয় বা রেখাচিত্রের মাধ্যমে এই বিন্দুটি সহজে চিহ্নিত করা সম্ভব। সঠিক সমচ্ছেদ বিন্দু নির্ণয়ের মাধ্যমে উদ্যোক্তাগণ তাদের উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, নিরাপদ বিক্রয়ের সীমা জানতে পারেন এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক ঝুঁকি হ্রাস করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন।


