ভূমিকা: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে জঁ-জ্যাক রুশো এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি মনে করতেন, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া উচিত জনকল্যাণের ভিত্তিতে। রুশোর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘সাধারণ ইচ্ছা’। তবে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন যে, জনগণের সমষ্টিগত মতামত বা ‘সকলের ইচ্ছা’ মানেই সবসময় ‘সাধারণ ইচ্ছা’ নয়। তাঁর মতে, সংখ্যাধিক্যের মতামতের চেয়ে জনকল্যাণের গুণগত মানই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
‘সাধারণ ইচ্ছা’ বনাম ‘সকলের ইচ্ছা’
রুশোর দর্শনে এই দুটি ধারণার মূল পার্থক্য নিচে আলোচনা করা হলো:
১. সংজ্ঞাগত পার্থক্য
সাধারণ ইচ্ছা (General Will): এটি সমাজের সকল সদস্যের সেই ইচ্ছা, যা শুধুমাত্র সাধারণ স্বার্থ বা জনকল্যাণের কথা চিন্তা করে। এটি একটি আদর্শগত ও নৈতিক ধারণা। এখানে ব্যক্তিগত স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে গোষ্ঠীগত মঙ্গলের কথা ভাবা হয়।
সকলের ইচ্ছা (Will of All): এটি হলো সমাজের প্রতিটি ব্যক্তির পৃথক পৃথক ব্যক্তিগত স্বার্থের সমষ্টি। এটি নিছক একটি গাণিতিক হিসাব, যেখানে প্রত্যেকে নিজের লাভ-ক্ষতি বিবেচনা করে মতামত দেয়।
২. গুণগত পার্থক্য
রুশোর মতে, সাধারণ ইচ্ছা সবসময় ন্যায়সংগত এবং অভ্রান্ত, কারণ এর লক্ষ্য হলো সাম্য ও স্বাধীনতা। পক্ষান্তরে, ‘সকলের ইচ্ছা’ ব্যক্তিগত লালসা বা সংকীর্ণ গোষ্ঠীতন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। যদি কোনো সিদ্ধান্ত কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থ রক্ষা করে কিন্তু বৃহত্তর সমাজের ক্ষতি করে, তবে তা ‘সকলের ইচ্ছা’ হতে পারে, কিন্তু ‘সাধারণ ইচ্ছা’ নয়।
৩. উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য
সাধারণ ইচ্ছা: এর ভিত্তি হলো ত্যাগ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। এটি ঐক্যবদ্ধ এবং অবিভাজ্য।
সকলের ইচ্ছা: এর ভিত্তি হলো স্বার্থপরতা। যখন কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা দল নিজেদের স্বার্থকে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়, তখন তা ‘সকলের ইচ্ছা’র বিকৃত রূপ ধারণ করে।
উক্তিটির গাণিতিক ও দার্শনিক তাৎপর্য
রুশো একটি চমৎকার গাণিতিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, যদি আমরা ব্যক্তিগত ইচ্ছাগুলোর মধ্যে থাকা পারস্পরিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা বিয়োগফলগুলোকে বাদ দেই, তবে যা অবশিষ্ট থাকে তাই হলো ‘সাধারণ ইচ্ছা’।
সাধারণ ইচ্ছা = সকলের ইচ্ছা – ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বন্দ্ব
অর্থাৎ, যখন মানুষ নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ভুলে গিয়ে সমগ্র সমাজের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে একটি সাধারণ ঐকমত্যে পৌঁছায়, তখনই সেটি প্রকৃত ‘সাধারণ ইচ্ছা’ হয়ে ওঠে। শুধু ভোটের সংখ্যা দিয়ে সাধারণ ইচ্ছাকে পরিমাপ করা যায় না; এর পেছনে থাকা উদ্দেশ্যের সততা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, রুশোর মতে ‘সকলের ইচ্ছা’ হলো সংখ্যার বিচার, আর ‘সাধারণ ইচ্ছা’ হলো গুণের বিচার। একটি সমাজ তখনই প্রকৃত গণতন্ত্র উপভোগ করতে পারে, যখন নাগরিকরা নিজেদের ব্যক্তিগত খামখেয়ালি বা ‘সকলের ইচ্ছা’কে বিসর্জন দিয়ে বৃহত্তর কল্যাণের প্রতীক ‘সাধারণ ইচ্ছা’র কাছে আত্মসমর্পণ করে। তাই রুশোর এই উক্তিটি আজও রাষ্ট্র পরিচালনায় জনকল্যাণ ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাপটের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।


