ভূমিকা
অর্থনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মতবাদ গড়ে উঠেছে, যা অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ধ্রুপদী অর্থনীতির পূর্বে ফ্রান্সে যে অর্থনৈতিক মতবাদ বিকশিত হয়, তা ভূমিবাদ (Physiocracy) নামে পরিচিত। অনেক বাংলা পাঠ্যবইয়ে একে রোমানীয় অর্থনৈতিক চিন্তাধারা বলা হলেও, এটি মূলত ফরাসি অর্থনৈতিক চিন্তাধারা। এই মতবাদের প্রবক্তারা বিশ্বাস করতেন যে কৃষিই জাতীয় সম্পদের একমাত্র প্রকৃত উৎস এবং প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী অর্থনীতি পরিচালিত হওয়া উচিত।
রোমানীয় (ভূমিবাদী) অর্থনৈতিক চিন্তাধারা
রোমানীয় বা ভূমিবাদী অর্থনৈতিক চিন্তাধারা হলো এমন একটি অর্থনৈতিক মতবাদ, যা ১৮শ শতাব্দীতে ফ্রান্সে বিকাশ লাভ করে। এর প্রধান প্রবক্তা ছিলেন François Quesnay। তিনি মনে করতেন, কৃষিই একমাত্র উৎপাদনশীল খাত এবং দেশের প্রকৃত সম্পদ সৃষ্টি হয় ভূমি থেকে। শিল্প ও বাণিজ্যকে তারা সহায়ক খাত হিসেবে বিবেচনা করতেন। এই মতবাদে রাষ্ট্রের অযথা হস্তক্ষেপের পরিবর্তে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ভূমিবাদের মূল বৈশিষ্ট্য
১. কৃষিকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান :
ভূমিবাদীদের মতে, কৃষিই একমাত্র উৎপাদনশীল খাত এবং জাতীয় সম্পদের প্রকৃত উৎস।
২. ভূমিই সম্পদের উৎস :
তাদের বিশ্বাস ছিল, প্রকৃতির দান হিসেবে ভূমি থেকেই নতুন সম্পদের সৃষ্টি হয়।
৩. অবাধ অর্থনৈতিক নীতি (Laissez-faire):
রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ছাড়া ব্যক্তি ও বাজারকে স্বাধীনভাবে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া উচিত।
৪. প্রকৃতির নিয়মের প্রতি আস্থা :
অর্থনীতি পরিচালনায় প্রাকৃতিক নিয়ম অনুসরণ করলে সর্বোচ্চ কল্যাণ নিশ্চিত হয় বলে তারা মনে করতেন।
৫. একক কর নীতি :
ভূমিবাদীরা ভূমির ওপর একটিমাত্র কর আরোপের পক্ষে ছিলেন এবং অন্যান্য করের বিরোধিতা করতেন।
৬. শিল্প ও বাণিজ্যকে অনুৎপাদনশীল খাত হিসেবে বিবেচনা :
তাদের মতে, শিল্প ও বাণিজ্য নতুন সম্পদ সৃষ্টি করে না; বরং কৃষিতে উৎপাদিত সম্পদের রূপান্তর ও বণ্টন করে।
৭. ব্যক্তিগত সম্পত্তির স্বীকৃতি :
ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারকে তারা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করতেন।
৮. অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সমর্থন :
মুক্ত প্রতিযোগিতা ও স্বাধীন বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থনীতির উন্নয়ন সম্ভব বলে তারা বিশ্বাস করতেন।
৯. জাতীয় আয়ের উৎস হিসেবে কৃষি :
জাতীয় আয়ের প্রধান ভিত্তি কৃষি হওয়ায় কৃষির উন্নয়নের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ভূমিবাদ অর্থনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যদিও কৃষিকে একমাত্র উৎপাদনশীল খাত হিসেবে বিবেচনা করার ধারণা বর্তমানে গ্রহণযোগ্য নয়, তবুও মুক্ত অর্থনীতি, ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং রাষ্ট্রের সীমিত হস্তক্ষেপের ধারণা পরবর্তী ধ্রুপদী অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। তাই অর্থনৈতিক চিন্তার বিবর্তনে ভূমিবাদের অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
