বাণিজ্যবাদ ভেঙ্গে পড়ার কারণসমূহ আলোচনা কর।

ভূমিকা

বাণিজ্যবাদ (Mercantilism) ছিল ১৬শ থেকে ১৮শ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপে প্রচলিত একটি অর্থনৈতিক মতবাদ। এই মতবাদ অনুযায়ী একটি দেশের সমৃদ্ধি নির্ভর করে স্বর্ণ ও রৌপ্যের মজুদের ওপর এবং রপ্তানি বৃদ্ধি ও আমদানি হ্রাসের মাধ্যমে জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি করা সম্ভব। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই মতবাদের নানা সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পায় এবং ধীরে ধীরে এটি বিলুপ্ত হয়ে মুক্ত বাণিজ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পথ প্রশস্ত করে।

বাণিজ্যবাদ ভেঙে পড়ার কারণসমূহ

১. শিল্পবিপ্লবের সূচনা :
শিল্পবিপ্লবের ফলে ব্যাপক উৎপাদন শুরু হয়। অধিক উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য মুক্ত বাজারের প্রয়োজন দেখা দেয়, যা বাণিজ্যবাদের কঠোর নিয়ন্ত্রণনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

২. অবাধ বাণিজ্যের ধারণার প্রসার :
অর্থনীতিবিদরা প্রমাণ করেন যে অবাধ বাণিজ্য সকল দেশের জন্য লাভজনক। ফলে বাণিজ্যবাদের আমদানি-নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি-নির্ভর নীতি অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

৩. অ্যাডাম স্মিথের সমালোচনা :
১৭৭৬ সালে Adam Smith তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Wealth of Nations-এ বাণিজ্যবাদের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি রাষ্ট্রের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের পরিবর্তে মুক্ত প্রতিযোগিতা ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন।

৪. কৃষিবাদী (Physiocrats) মতবাদের উত্থান :
ফ্রান্সের কৃষিবাদী অর্থনীতিবিদরা মনে করতেন, প্রকৃত সম্পদের উৎস হলো কৃষি, স্বর্ণ বা রৌপ্য নয়। তাদের এই মতবাদ বাণিজ্যবাদের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।

৫. উপনিবেশ রক্ষার উচ্চ ব্যয় :
বাণিজ্যবাদ টিকিয়ে রাখতে উপনিবেশ স্থাপন ও রক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হতো। এই ব্যয় অনেক দেশের জন্য অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

৬. একচেটিয়া বাণিজ্যের বিরূপ প্রভাব :
বাণিজ্যবাদে বিভিন্ন কোম্পানিকে একচেটিয়া বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়া হতো। এতে প্রতিযোগিতা কমে যায়, দুর্নীতি বৃদ্ধি পায় এবং বাজারব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৭. আন্তর্জাতিক বিরোধ ও যুদ্ধ :
উপনিবেশ দখল ও বাণিজ্যিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে বহু যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এসব যুদ্ধ বাণিজ্যবাদের দুর্বলতা স্পষ্ট করে তোলে।

৮. জনগণের অসন্তোষ :
উচ্চ শুল্ক, কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং পণ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।

৯. অর্থনৈতিক চিন্তার পরিবর্তন :
১৮শ শতাব্দীতে ধ্রুপদী অর্থনীতির বিকাশ ঘটে। উৎপাদন, শ্রম, বাজার ও প্রতিযোগিতার গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় বাণিজ্যবাদ তার গ্রহণযোগ্যতা হারায়।

উপসংহার

বাণিজ্যবাদ একসময় ইউরোপের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিল্পবিপ্লব, মুক্ত বাণিজ্যের ধারণা, নতুন অর্থনৈতিক মতবাদের বিকাশ এবং অর্থনীতিবিদদের সমালোচনার ফলে বাণিজ্যবাদ ভেঙে পড়ে। এর পরিবর্তে ধ্রুপদী অর্থনীতি ও মুক্তবাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত।