ভূমিকা
বাণিজ্যবাদ (Mercantilism) ছিল ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপে প্রচলিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চিন্তাধারা। এই মতবাদ অনুযায়ী একটি দেশের সমৃদ্ধি নির্ভর করে তার স্বর্ণ-রৌপ্যের মজুদ বৃদ্ধি এবং অনুকূল বাণিজ্য ভারসাম্য (Favourable Balance of Trade)-এর ওপর। এই চিন্তাধারার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ছিলেন ইংরেজ অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী টমাস মুন (Thomas Mun)। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ England’s Treasure by Foreign Trade-এ বাণিজ্যবাদকে সুসংগঠিত ও যুক্তিসম্মত ভিত্তি প্রদান করেন। তাই বাণিজ্যবাদী অর্থনৈতিক চিন্তার বিকাশে টমাস মুনের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টমাস মুন-এর অবদান
১. অনুকূল বাণিজ্য ভারসাম্যের তত্ত্ব প্রদান
টমাস মুনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো তিনি প্রমাণ করেন যে একটি দেশের আমদানির তুলনায় রপ্তানি বেশি হলে দেশ সম্পদশালী হয়। অর্থাৎ রপ্তানি থেকে অর্জিত অর্থের মাধ্যমে দেশে স্বর্ণ ও রৌপ্য প্রবেশ করে এবং জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি পায়।
২. বৈদেশিক বাণিজ্যের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা
তিনি মনে করতেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির প্রধান মাধ্যম হলো বৈদেশিক বাণিজ্য। বিদেশে অধিক পণ্য রপ্তানি করে দেশের সম্পদ বৃদ্ধি করা সম্ভব। তাই তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণকে বিশেষ গুরুত্ব দেন।
৩. স্বর্ণ-রৌপ্য রপ্তানির যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা
তৎকালীন অনেক বাণিজ্যবাদী স্বর্ণ ও রৌপ্য বিদেশে পাঠানোর বিরোধিতা করলেও টমাস মুন যুক্তি দেন যে, যদি স্বর্ণ-রৌপ্য বিদেশে বিনিয়োগ করে অধিক লাভসহ দেশে ফিরিয়ে আনা যায়, তবে তা দেশের জন্য উপকারী। এভাবে তিনি বাস্তবধর্মী অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
৪. রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রসারের পক্ষে মত
তিনি দেশীয় শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উন্নত মানের পণ্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেন, যাতে বিদেশে বেশি পণ্য রপ্তানি করা যায়। এর ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং জাতীয় আয়ও বৃদ্ধি পায়।
৫. বিলাসপণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করা
টমাস মুন মনে করতেন, অপ্রয়োজনীয় বিলাসপণ্য আমদানি দেশের অর্থ বিদেশে নিয়ে যায়। তাই তিনি বিলাসপণ্য আমদানি কমিয়ে উৎপাদনশীল ও প্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন।
৬. নৌবাণিজ্য ও জাহাজ শিল্পের উন্নয়নে গুরুত্ব
তিনি দেশীয় জাহাজ ব্যবহার করে বাণিজ্য পরিচালনার পরামর্শ দেন। এর ফলে পরিবহন ব্যয় কমে, নৌশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং বিদেশি জাহাজের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস পায়।
৭. রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকার সমর্থন
টমাস মুন বিশ্বাস করতেন যে সরকারকে বাণিজ্য ও শিল্পের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি শুল্কনীতি, রপ্তানি উৎসাহ এবং দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার পক্ষে মত দেন।
৮. ইংল্যান্ডের অর্থনৈতিক উন্নয়নে দিকনির্দেশনা
তাঁর নীতিগুলো ইংল্যান্ডের বাণিজ্য সম্প্রসারণ, উপনিবেশ বিস্তার এবং অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীকালে ইংল্যান্ডের অর্থনৈতিক নীতিতেও তাঁর চিন্তার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
টমাস মুন-এর চিন্তাধারার সমালোচনা
- তিনি কৃষিখাতের তুলনায় বাণিজ্য ও শিল্পকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছেন।
- স্বর্ণ-রৌপ্যকে সম্পদের প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা আধুনিক অর্থনীতিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
- অতিরিক্ত রপ্তানিনির্ভর নীতি সব দেশের জন্য বাস্তবসম্মত নয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, টমাস মুন বাণিজ্যবাদী চিন্তাধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা। অনুকূল বাণিজ্য ভারসাম্য, বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশ এবং রাষ্ট্রের সক্রিয় অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে তিনি বাণিজ্যবাদকে সুসংগঠিত রূপ দেন। যদিও আধুনিক অর্থনীতিতে তাঁর সব মতবাদ সমানভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, তবুও অর্থনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে এবং বাণিজ্যবাদের বিকাশে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।
