অথবা, বাংলাদেশের সংবিধানের সংশোধন পদ্ধতি আলোচনা কর।
ভূমিকা
একটি রাষ্ট্র কোন আদর্শের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে এবং নাগরিকদের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক কেমন হবে, তার দিকনির্দেশনা থাকে সংবিধানের মূলনীতিতে। ১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের মূল সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি প্রধান স্তম্ভ বা মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়। সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে (অনুচ্ছেদ ৮ থেকে ২৫) এই নীতিসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
মূলনীতি বলতে কী বুঝায়?
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বলতে বোঝায় সেই সকল আদর্শ ও চেতনাকে, যা সরকারের আইন প্রণয়ন, শাসনকার্য পরিচালনা এবং বিচারকার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। এগুলো মূলত রাষ্ট্রের লক্ষ্য এবং জাতির আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
রাষ্ট্র পরিচালনার ৪টি প্রধান মূলনীতি
সংবিধানের ৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলো হলো:
১. জাতীয়তাবাদ (Nationalism): বাঙালি জাতি ভাষা ও সংস্কৃতির ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এই ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত ঐক্যই হলো জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি।
২. সমাজতন্ত্র ও শোষণমুক্তি (Socialism and freedom from exploitation): একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং মানুষের ওপর মানুষের শোষণ বন্ধ করে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এই নীতির লক্ষ্য।
৩. গণতন্ত্র (Democracy): প্রজাতন্ত্র হবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে এবং প্রশাসনের সকল স্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে।
৪. ধর্মনিরপেক্ষতা (Secularism): রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দেবে না। প্রত্যেক নাগরিক নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবে এবং ধর্মের নামে কোনো রাজনৈতিক বৈষম্য করা হবে না।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক নীতি
প্রধান চারটি নীতির পাশাপাশি সংবিধান আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রাষ্ট্রকে অর্পণ করেছে:
মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা: অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা।
গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লব: শহর ও গ্রামের বৈষম্য দূর করা।
অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা: নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত সকল শিশুর জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা।
জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা: মদ্যপান ও জুয়া খেলা বন্ধ এবং স্বাস্থ্যের উন্নয়ন।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সংবিধানের মূলনীতিসমূহ কেবল রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, বরং এটি একটি শোষণমুক্ত, উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার ব্লু-প্রিন্ট। যদিও এই নীতিসমূহ আদালতের মাধ্যমে সরাসরি কার্যকর করা যায় না (অনুচ্ছেদ ৮(২) অনুযায়ী), তবুও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এগুলোই হলো প্রধান মাপকাঠি। একটি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার জন্য এই মূলনীতিগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন অপরিহার্য।


