ভূমিকা
গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাঁর সমসাময়িক এথেন্সের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দুর্নীতির হাত থেকে সমাজকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে ‘আদর্শ রাষ্ট্র’র ধারণা প্রদান করেন। তাঁর মতে, একটি আদর্শ রাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ‘ন্যায়বিচার’ (Justice) প্রতিষ্ঠা করা। তিনি রাষ্ট্রকে ব্যক্তির একটি বৃহৎ রূপ (State is individual writ large) হিসেবে কল্পনা করেছেন।
১. মানব আত্মার তিনটি গুণ
প্লেটো মানুষের আত্মাকে তিনটি গুণের সমন্বয়ে ভাগ করেছেন:
বিবেচনা বা প্রজ্ঞা (Reason)
সাহস (Spirit) * ক্ষুধা বা কামনা (Appetite) এই তিন গুণের ওপর ভিত্তি করেই তিনি আদর্শ রাষ্ট্রের নাগরিকদের তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন।
২. নাগরিকদের তিনটি শ্রেণি
একটি আদর্শ রাষ্ট্রে তিন ধরনের মানুষ থাকবে:
দার্শনিক রাজা (Philosophical Class): যাঁদের মধ্যে ‘প্রজ্ঞা’ প্রধান। তাঁরা দেশ শাসন করবেন।
যোদ্ধা শ্রেণি (Military Class): যাঁদের মধ্যে ‘সাহস’ প্রধান। তাঁরা দেশ রক্ষা করবেন।
উৎপাদক শ্রেণি (Producing Class): যাঁদের মধ্যে ‘ক্ষুধা বা কামনা’ প্রধান। তাঁরা কৃষক, শ্রমিক বা ব্যবসায়ী হিসেবে কাজ করবেন এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাবেন।
৩. দার্শনিক রাজার শাসন
প্লেটোর মতে, “যতক্ষণ পর্যন্ত দার্শনিকরা রাজা না হবেন অথবা রাজারা দর্শনের জ্ঞানে দীক্ষিত না হবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রের দুঃখ-দুর্দশা ঘুচবে না।” দার্শনিক রাজারা হবেন নির্লোভ এবং জ্ঞানী, যাঁরা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে জনকল্যাণে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।
৪. শিক্ষা ব্যবস্থা
আদর্শ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্লেটো একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলেছেন। এই শিক্ষা ব্যবস্থা হবে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত এবং এর উদ্দেশ্য হবে দক্ষ প্রশাসক ও সুনাগরিক গড়ে তোলা। তিনি নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই সমান শিক্ষার অধিকার সমর্থন করেছিলেন।
৫. সাম্যবাদ (Communism)
প্লেটোর সাম্যবাদ সবার জন্য নয়, কেবল শাসক ও যোদ্ধা শ্রেণির (যাঁদের তিনি ‘অভিভাবক শ্রেণি’ বলেছেন) জন্য প্রযোজ্য।
সম্পত্তির সাম্যবাদ: শাসক ও যোদ্ধাদের কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকবে না, যাতে তাঁরা দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকেন।
পরিবারের সাম্যবাদ: তাঁদের কোনো ব্যক্তিগত পরিবার বা স্থায়ী বিবাহ বন্ধন থাকবে না। প্লেটো মনে করতেন, পরিবার মানুষের মধ্যে সংকীর্ণ মায়া ও স্বার্থপরতা তৈরি করে।
৬. ন্যায়বিচার (Justice)
প্লেটোর কাছে ন্যায়বিচার মানে হলো— প্রত্যেকে নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী নির্ধারিত কাজ করবে এবং কেউ অন্যের কাজে হস্তক্ষেপ করবে না। যখন তিনটি শ্রেণি নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবে, তখনই রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণাটি অনেকটা কল্পনাপ্রসূত বা ইউটোপিয়ান (Utopian) মনে হলেও, এর মূল লক্ষ্য ছিল একটি শোষণমুক্ত ও সুশাসিত রাষ্ট্র গঠন। যদিও তাঁর সাম্যবাদ বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ অনেক সমালোচনার মুখে পড়েছে, তবুও শাসন ব্যবস্থায় মেধা ও শিক্ষার গুরুত্ব এবং ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয়তা আজও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।


