ভূমিকা
১৯৫৮ সালে সামরিক শাসনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামক একটি নতুন রাজনৈতিক কাঠামো প্রবর্তন করেন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, যার চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়ায় ১৯৬৯ সালে ছাত্র-জনতার এক বিশাল গণবিস্ফোরণ ঘটে, যা ইতিহাসে ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান’ নামে পরিচিত।
মৌলিক গণতন্ত্র (Basic Democracy) মৌলিক গণতন্ত্র ছিল আইয়ুব খান প্রবর্তিত একটি পরোক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা। ১৯৫৯ সালে তিনি এক আদেশের মাধ্যমে এটি চালু করেন।
এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
কাঠামো: এটি ছিল ৪ স্তরবিশিষ্ট একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা (ইউনিয়ন কাউন্সিল, থানা কাউন্সিল, জেলা কাউন্সিল ও বিভাগীয় কাউন্সিল)।
বিডি মেম্বার: পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে মোট ৮০,০০০ (পরে ১,২০,০০০) নিম্নস্তরের প্রতিনিধি বা ‘মৌলিক গণতন্ত্রী’ নির্বাচিত হতেন।
ভোটাধিকার হরণ: সাধারণ জনগণ সরাসরি প্রেসিডেন্ট বা জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত করতে পারতেন না। জনগণের কাজ ছিল কেবল এই ৮০ হাজার বিডি মেম্বার নির্বাচন করা। পরবর্তীতে এই মেম্বারদের ভোটেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতেন।
উদ্দেশ্য: প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল আইয়ুব খানের ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার এবং জনগণকে রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে দূরে রাখার একটি কৌশল।
গণঅভ্যুত্থান (Mass Upsurge)
১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা আইয়ুব বিরোধী যে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে ওঠে, তাকেই ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান বলা হয়। এটি ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক মোড়।
প্রেক্ষাপট: আইয়ুব খানের স্বৈরশাসন, ৬-দফার প্রতি অবজ্ঞা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র প্রতিবাদে এই আন্দোলন শুরু হয়।
ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ: ছাত্রদের ১১-দফা আন্দোলনের মাধ্যমে এই গণজোয়ার তৈরি হয়। ২০ জানুয়ারি আসাদ এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হকের মৃত্যু এই আন্দোলনকে দাবানলে পরিণত করে।
ফলাফল: এই গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব খান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় আসেন।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ ছিল স্বৈরশাসন দীর্ঘায়িত করার একটি কৃত্রিম ব্যবস্থা, যা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল। আর এই ব্যর্থতা ও শোষণের বিরুদ্ধেই ‘গণঅভ্যুত্থান’ ছিল বাঙালির চূড়ান্ত প্রতিবাদ। এই অভ্যুত্থানই ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালির নিরঙ্কুশ বিজয় এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করেছিল।


