এ্যাডাম স্মিথকে অর্থনীতির জনক বলা হয় কেন? “বৈদেশিক ঋণ সর্বদাই খারাপ নয়”—উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।

ভূমিকা

অর্থনীতি এমন একটি সামাজিক বিজ্ঞান, যা মানুষের সীমাহীন চাহিদা ও সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের উপায় নিয়ে আলোচনা করে। আধুনিক অর্থনীতির বিকাশে অনেক অর্থনীতিবিদের অবদান থাকলেও এ্যাডাম স্মিথের অবদান সর্বাধিক। তাঁর চিন্তাধারা অর্থনীতিকে একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাই তাঁকে অর্থনীতির জনক বলা হয়।

এ্যাডাম স্মিথকে অর্থনীতির জনক বলা হয় যেসব কারণে

১. প্রথম বৈজ্ঞানিক অর্থনীতির গ্রন্থ রচনা:
১৭৭৬ সালে তিনি The Wealth of Nations গ্রন্থ রচনা করেন, যা আধুনিক অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃত।

২. অর্থনীতিকে স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা:
তিনি অর্থনীতিকে দর্শন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান থেকে পৃথক করে একটি স্বাধীন সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

৩. অবাধ বাণিজ্যের ধারণা প্রদান:
তিনি মুক্তবাজার ও অবাধ বাণিজ্যের পক্ষে মত দেন এবং সরকারি হস্তক্ষেপ কমানোর কথা বলেন।

৪. অদৃশ্য হাত (Invisible Hand) তত্ত্ব:
তিনি বলেন, ব্যক্তির নিজস্ব লাভের প্রচেষ্টা সমাজের সামগ্রিক কল্যাণেও ভূমিকা রাখে। এই ধারণাকে “অদৃশ্য হাত” তত্ত্ব বলা হয়।

৫. শ্রমবিভাগের গুরুত্ব ব্যাখ্যা:
তিনি দেখিয়েছেন, শ্রমবিভাগ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে এবং জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

৬. জাতীয় সম্পদের গুরুত্ব তুলে ধরা:
তিনি মনে করতেন, একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ হলো তার উৎপাদনশীলতা ও জনগণের শ্রম।

৭. আধুনিক অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন:
বর্তমানের ক্ষুদ্র অর্থনীতি, বাজারব্যবস্থা, প্রতিযোগিতা ও মূল্যব্যবস্থার অনেক ধারণার ভিত্তি তাঁর চিন্তাধারা।

উপসংহার

এ্যাডাম স্মিথের তত্ত্ব ও গবেষণা আধুনিক অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন করেছে। অর্থনীতিকে একটি স্বতন্ত্র ও বৈজ্ঞানিক শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারণা প্রদানের জন্য তাঁকে যথার্থই অর্থনীতির জনক বলা হয়।


২। “বৈদেশিক ঋণ সর্বদাই খারাপ নয়”—উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।

ভূমিকা

উন্নয়নশীল দেশগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রায়ই বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করে। অনেকেই বৈদেশিক ঋণকে নেতিবাচকভাবে দেখলেও সঠিক পরিকল্পনা ও যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে এটি একটি দেশের উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। তাই বলা হয়, “বৈদেশিক ঋণ সর্বদাই খারাপ নয়।”

উক্তিটির ব্যাখ্যা

১. উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন:
বড় বড় সেতু, মহাসড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর ও শিল্পপ্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২. কর্মসংস্থান সৃষ্টি:
ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করলে নতুন শিল্প গড়ে ওঠে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়।

৩. অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি:
সঠিকভাবে ব্যবহৃত বৈদেশিক ঋণ উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

৪. প্রযুক্তি ও দক্ষতা অর্জন:
অনেক বৈদেশিক ঋণের সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা পাওয়া যায়, যা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়ক।

৫. জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা:
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি বা অর্থনৈতিক সংকটে বৈদেশিক ঋণ দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।

৬. তবে অপব্যবহার ক্ষতিকর:
যদি ঋণের অর্থ অপচয় হয়, দুর্নীতি হয় বা অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করা হয়, তাহলে ঋণের বোঝা বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

উপসংহার

বৈদেশিক ঋণ নিজে ভালো বা খারাপ নয়; এর ফলাফল নির্ভর করে ঋণের সুষ্ঠু ব্যবহার, স্বচ্ছতা এবং যথাসময়ে পরিশোধের সক্ষমতার ওপর। তাই উন্নয়নমূলক ও উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহৃত বৈদেশিক ঋণ একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। এজন্যই বলা হয়, “বৈদেশিক ঋণ সর্বদাই খারাপ নয়।”