ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও সিরাজউদ্দৌলার মধ্যে বিরোধের কারণ বিশ্লেষণ

উত্তরটি নেয়া হয়েছে

থেকে

ভূমিকা

১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে নবাব আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর তাঁর প্রিয় দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা মাত্র ২৩ বছর বয়সে বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। কিন্তু সিরাজউদ্দৌলার ক্ষমতা গ্রহণের সূচনা থেকেই তাঁর সামনে দেখা দেয় গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট। একদিকে পরিবারের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র, অন্যদিকে বাংলায় অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে থাকা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔদ্ধত্য। নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যবর্তী এই বৈরিতা শেষ পর্যন্ত ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ঐতিহাসিক পলাশীর যুদ্ধে রূপ নেয়, যা বাংলার তথা সমগ্র ভারতের স্বাধীনতা হারানোর পথ প্রশস্ত করে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও সিরাজউদ্দৌলার মধ্যকার বিরোধ কোনো একক ঘটনার ফল ছিল না; বরং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও কূটনৈতিক বিভিন্ন সংঘাতের সমষ্টি ছিল।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও সিরাজউদ্দৌলার বিরোধের মূল কারণসমূহ

  1. নবাবকে সৌজন্য প্রদর্শন না করা ও নজরানা না পাঠানো: বাংলার প্রচলিত রাজনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো নতুন নবাব সিংহাসনে বসলে বিদেশি বণিক সম্প্রদায় ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা উপহার ও নজরানা পাঠিয়ে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করতো। ফরাসি, ওলন্দাজ প্রভৃতি বণিক দল নিয়ম মেনে নবীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে উপঢৌকন পাঠালেও ইংরেজ কোম্পানি কোনো প্রকার শুভেচ্ছা প্রকাশ করেনি কিংবা নজরানা পাঠায়নি। ইংরেজদের এই আচরণ ছিল নবীন নবাবের প্রতি চরম অবমাননাকর ও প্রথা বিরোধী।
  2. দস্তকের অপব্যবহার ও বাণিজ্যিক শর্ত লঙ্ঘন: ১৭১৭ সালে মুঘল সম্রাট ফাররুখসিয়ার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বার্ষিক মাত্র ৩,০০০ টাকার বিনিময়ে বাংলায় বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার যে সনদ বা ‘দস্তক’ প্রদান করেছিলেন, ইংরেজরা তার অপব্যবহার করতে থাকে। কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত ব্যবসায় এই দস্তক ব্যবহার করে বিপুল মুনাফা অর্জন করছিল এবং দেশীয় বণিকদের এই সুবিধা বিক্রি করে নবাবকে রাজস্ব বঞ্চিত করছিল। নবাব সিরাজউদ্দৌলা এই অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করতে এবং যথাযথ শুল্ক প্রদান করতে বললে ইংরেজরা তা প্রত্যাখান করে, যা বিরোধকে চরম রূপ দেয়।
  3. ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি: ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ (১৭৫৬-১৭৬৩) শুরু হলে ইংরেজ ও ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় নিজেদের সামরিক ঘাঁটি শক্তিশালী করার চেষ্টা করে। নবাব সিরাজউদ্দৌলা সার্বভৌমত্বের স্বার্থে উভয় পক্ষকে দুর্গের সংস্কার বা অতিরিক্ত সৈন্য বৃদ্ধি করতে কঠোর নির্দেশ দেন। ফরাসিরা নবাবের নির্দেশ মান্য করলেও ইংরেজরা কলকাতা ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের প্রাচীর পুনর্নির্মাণ ও নতুন করে পরিখা খনন অব্যাহত রাখে। এটি ছিল নবাবের প্রশাসনিক ক্ষমতার স্পষ্ট লঙ্ঘন।
  4. রাজবল্লভ ও কৃষ্ণদাসের পলায়ন এবং আশ্রয় প্রদান: নবাব আলীবর্দী খানের সময় ঢাকার দেওয়ান রাজবল্লভের বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ তছরুপের অভিযোগ ছিল। সিরাজউদ্দৌলা হিসাব তলব করলে রাজবল্লভ তার পুত্র কৃষ্ণদাসকে রাজকোষের বিপুল অর্থসম্পদ ও পরিবারসহ কলকাতায় ইংরেজদের আশ্রয়ে পাঠিয়ে দেন। নবাব কৃষ্ণদাসকে ফেরত চাওয়ার জন্য দূত পাঠালে ইংরেজ গভর্নর ড্রেক নবাবের রাজদূত নারায়ণ সিংহকে চরম অপমান করে তাড়িয়ে দেন। সার্বভৌম নবাবের আদেশের প্রতি ইংরেজদের এই ঔদ্ধত্য সিরাজউদ্দৌলাকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
  5. নবাবের অভ্যন্তরীণ শত্রুদের মদদ দান: নবাব সিরাজউদ্দৌলার সিংহাসন আরোহণে তাঁর খালা ঘসেটি বেগম, খালাতো ভাই শওকত জঙ্গ এবং সেনাপতি মির্জাফর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নবাবের বিরুদ্ধে চলা এই পারিবারিক ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে সরাসরি অর্থ ও বুদ্ধি দিয়ে সাহায্য করেছিল। তারা নবাবকে দুর্বল করে নিজেদের পুতুল শাসক বসানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সক্রিয় হয়।
  6. কৃষ্ণনগর রাজপরিবার ও মার্চেন্ট ক্লাবের ষড়যন্ত্র: বাংলার উদীয়মান বণিক গোষ্ঠী জগত শেঠ, উমিচাঁদ এবং রায়দুর্লভদের সঙ্গে ইংরেজদের গোপন যোগাযোগ গভীর হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বুঝেছিল যে, স্বাধীনচেতা সিরাজউদ্দৌলাকে সরিয়ে কোনো নমনীয় শাসককে বসাতে পারলে তারা একচেটিয়া বাণিজ্য সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পারবে।
  7. নবাব কর্তৃক কলকাতা আক্রমণ ও হলওয়েলের ‘অন্ধকূপ হত্যা’ কাহিনী: ইংরেজদের একের পর এক নির্দেশ অমান্য ও অপমানের জবাবে নবাব ১৭৫৬ সালের জুন মাসে কাসিমবাজার কুঠি এবং পরবর্তীতে কলকাতা আক্রমণ করে দখল করেন। এ সময় ড্রেক সহ অনেক ইংরেজ পালিয়ে যায়। এই ঘটনার পর ইংরেজ লেখক হলওয়েল ‘অন্ধকূপ হত্যা’ (Black Hole Tragedy) নামক এক কাল্পনিক ও অতিরঞ্জিত কাহিনী প্রচার করে ইংরেজদের প্রতিশোধস্পৃহাকে উসকে দেয়, যা সংঘাতকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।

উপসংহার

উপসংহারে বলা যায়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার মধ্যকার বিরোধ ছিল মূলত দেশীয় সার্বভৌমত্ব এবং সাম্রাজ্যবাদী বাণিজ্যিক লিপ্সার মধ্যকার সংঘাত। সিরাজউদ্দৌলা কোনো যুদ্ধবাজ শাসক ছিলেন না; বরং একজন স্বাধীন নবাব হিসেবে দেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক নীতি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে, ইংরেজদের মূল উদ্দেশ্য ছিল নবাবকে তোয়াক্কা না করে একচেটিয়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ প্রতিষ্ঠা করা। এই দ্বিবিধ স্বার্থের সংঘাতের ফলেই ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রাঙ্গণে প্রহসনমূলক যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যার ফলশ্রুতিতে সিরাজউদ্দৌলার পতন ঘটে এবং ২০০ বছরের জন্য বাংলায় ব্রিটিশ শাসন-শোষণের সূচনা হয়।