অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ‘প্রবল ধাক্কা’ প্রয়োজন কেন? বাণিজ্যবাদ উদ্ভবের কারণগুলো লিখ।

ভূমিকা

অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। অনেক অনুন্নত দেশে দারিদ্র্য, স্বল্প বিনিয়োগ, কম উৎপাদন এবং সীমিত বাজারের কারণে অর্থনীতি একটি দুষ্টচক্রে আবদ্ধ থাকে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য অর্থনীতিবিদ রোজেনস্টাইন-রোডান (Rosenstein-Rodan) ‘প্রবল ধাক্কা’ (Big Push Theory)-এর ধারণা প্রদান করেন। অন্যদিকে, ইউরোপে আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সূচনালগ্নে বাণিজ্যবাদ (Mercantilism) একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মতবাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়। রাষ্ট্রের সম্পদ বৃদ্ধি, বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং স্বর্ণ-রৌপ্যের মজুদ বৃদ্ধিই ছিল এর প্রধান লক্ষ্য।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ‘প্রবল ধাক্কা’ প্রয়োজন কেন?

১. দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ভাঙতে: অনুন্নত দেশে আয় কম হওয়ায় সঞ্চয় ও বিনিয়োগ কম হয়। বৃহৎ বিনিয়োগের মাধ্যমে এই দুষ্টচক্র ভাঙতে প্রবল ধাক্কা প্রয়োজন।

২. বৃহৎ আকারে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে: বিচ্ছিন্ন বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ঘটাতে পারে না। একযোগে বিভিন্ন খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে।

৩. শিল্পায়নকে গতিশীল করতে: একাধিক শিল্প একসঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হলে তারা একে অপরের বাজার সৃষ্টি করে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

৪. কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে: বৃহৎ বিনিয়োগের ফলে নতুন শিল্প ও অবকাঠামো গড়ে ওঠে, যা ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।

৫. উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধি করতে: উৎপাদন বাড়লে জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায় এবং জনগণের জীবনমান উন্নত হয়।

৬. বাজার সম্প্রসারণে সহায়তা করতে: বিভিন্ন শিল্পের সমন্বিত উন্নয়নের ফলে পণ্য ও সেবার চাহিদা বৃদ্ধি পায় এবং বাজারের প্রসার ঘটে।

৭. অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটাতে: বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পরিবহন ও শিক্ষা খাতে একযোগে উন্নয়ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে।

৮. বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে: সরকারি বৃহৎ বিনিয়োগ বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও বিনিয়োগে আগ্রহী করে তোলে।

৯. প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটাতে: বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পায়, ফলে উৎপাদনশীলতা বাড়ে।

১০. টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে: প্রবল ধাক্কার মাধ্যমে অর্থনীতি স্থবিরতা কাটিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথে অগ্রসর হয়।

বাণিজ্যবাদ উদ্ভবের কারণসমূহ

১. জাতীয় রাষ্ট্রের উত্থান: ইউরোপে শক্তিশালী জাতীয় রাষ্ট্র গঠনের ফলে অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির প্রয়োজন দেখা দেয়।

২. ভৌগোলিক আবিষ্কার: নতুন সমুদ্রপথ ও নতুন দেশের আবিষ্কারের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটে।

৩. উপনিবেশ স্থাপন: ইউরোপীয় শক্তিগুলো উপনিবেশ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং প্রস্তুত পণ্য বিক্রির সুযোগ পায়।

৪. স্বর্ণ ও রৌপ্যের গুরুত্ব: সে সময় স্বর্ণ ও রৌপ্যকে জাতীয় সম্পদের প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

৫. জনসংখ্যা বৃদ্ধি: জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ও বাণিজ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়।

৬. রেনেসাঁ ও ধর্মসংস্কার আন্দোলন: নতুন চিন্তাধারা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বিকাশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করে।

৭. বাণিজ্যিক বিপ্লব: ব্যাংক, বীমা, যৌথ মূলধনী কোম্পানি এবং আধুনিক বাণিজ্য ব্যবস্থার বিকাশ বাণিজ্যবাদকে শক্তিশালী করে।

৮. শিল্প ও কারুশিল্পের উন্নয়ন: উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদেশি বাজারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

৯. সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা: রাষ্ট্র রপ্তানি বৃদ্ধি, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে নানা নীতি গ্রহণ করে।

১০. পুঁজিবাদের প্রাথমিক বিকাশ: পুঁজি সঞ্চয় ও মুনাফা অর্জনের প্রবণতা বাণিজ্যবাদের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

উপসংহার

অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ‘প্রবল ধাক্কা’ তত্ত্ব অনুন্নত দেশগুলোকে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে মুক্ত হয়ে দ্রুত উন্নয়নের পথ দেখায়। একইভাবে, বাণিজ্যবাদ ইউরোপে আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও বর্তমানে বাণিজ্যবাদের অনেক নীতি পরিবর্তিত হয়েছে, তবুও শিল্পায়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং জাতীয় অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজও স্বীকৃত।