অবাধ বাণিজ্য কী? বাংলাদেশে সংরক্ষণের পক্ষে যুক্তিসহ আলোচনা কর।

ভূমিকা

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো অবাধ বাণিজ্য (Free Trade)। অবাধ বাণিজ্যে সরকার আমদানি-রপ্তানির ওপর শুল্ক, কোটা বা অন্যান্য বাধা যতটা সম্ভব কমিয়ে দেয়, যাতে পণ্য ও সেবা সহজে এক দেশ থেকে অন্য দেশে প্রবাহিত হতে পারে। তবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রে দেশীয় শিল্প ও অর্থনীতির স্বার্থে সংরক্ষণমূলক বাণিজ্যনীতি (Protective Trade Policy) গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ কারণে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংরক্ষণের পক্ষে বিভিন্ন শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে।

অবাধ বাণিজ্যের সংজ্ঞা

অবাধ বাণিজ্য হলো এমন একটি বাণিজ্য ব্যবস্থা যেখানে সরকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর অপ্রয়োজনীয় শুল্ক, কোটা, ভর্তুকি বা অন্যান্য বিধিনিষেধ আরোপ করে না। ফলে দেশগুলোর মধ্যে পণ্য ও সেবার অবাধ আদান-প্রদান সম্ভব হয়।

বাংলাদেশে সংরক্ষণের পক্ষে যুক্তিসমূহ

১. নবীন শিল্পের সুরক্ষা (Infant Industry Protection):
বাংলাদেশের অনেক নতুন শিল্প এখনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য যথেষ্ট সক্ষম নয়। সংরক্ষণমূলক নীতি এসব শিল্পকে বিকাশের সুযোগ দেয়।

২. দেশীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি:
বিদেশি পণ্যের অবাধ প্রবেশ সীমিত হলে দেশীয় শিল্পের উৎপাদন বাড়ে, নতুন কারখানা গড়ে ওঠে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

৩. বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়:
অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় রোধ করা যায়, যা দেশের অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করে।

৪. দেশীয় শিল্পের বিকাশ:
সংরক্ষণমূলক নীতির মাধ্যমে স্থানীয় উদ্যোক্তারা উৎপাদন বৃদ্ধি ও নতুন শিল্প স্থাপনে উৎসাহিত হন, ফলে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হয়।

৫. বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস:
অতিরিক্ত আমদানির ফলে সৃষ্ট বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

৬. জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ:
খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৭. সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি:
আমদানি শুল্ক আরোপের মাধ্যমে সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব অর্জন করতে পারে, যা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করা সম্ভব।

৮. ডাম্পিং প্রতিরোধ:
অনেক সময় বিদেশি প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত কম দামে পণ্য বিক্রি করে দেশীয় শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা এ ধরনের ডাম্পিং প্রতিরোধে সহায়ক।

৯. কৃষি খাতের সুরক্ষা:
বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠী কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বিদেশি কৃষিপণ্যের অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা থেকে কৃষকদের রক্ষার জন্য সংরক্ষণ প্রয়োজন।

১০. অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন:
দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি ও আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন করা সম্ভব।

উপসংহার

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অবাধ বাণিজ্যের সুবিধা থাকলেও সম্পূর্ণ অবাধ বাণিজ্য সবসময় অর্থনীতির জন্য উপযোগী নয়। দেশীয় শিল্প, কর্মসংস্থান, কৃষি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সুরক্ষার স্বার্থে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংরক্ষণমূলক বাণিজ্যনীতি গ্রহণ করা অত্যন্ত যৌক্তিক। তাই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশকে সুষম ও বাস্তবসম্মত বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করতে হবে।