ভূমিকা
অর্থনীতির ইতিহাসে John Maynard Keynes এবং Karl Marx-এর তত্ত্ব দুটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কেইনসের তারল্য ফাঁদ (Liquidity Trap) ধারণা মুদ্রানীতির সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করে, আর মার্ক্সের উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব (Theory of Surplus Value) পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় শ্রমিকের শোষণের কারণ তুলে ধরে। আধুনিক সামষ্টিক অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতিতে উভয় তত্ত্বেরই বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
(ক) কেইনসীয় তত্ত্বে তারল্য ফাঁদের তাৎপর্য
তারল্য ফাঁদ হলো এমন একটি অর্থনৈতিক অবস্থা, যখন সুদের হার অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে এবং মানুষ ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়বে ও বন্ডের দাম কমবে এই আশঙ্কায় নগদ অর্থ হাতে রাখতে বেশি আগ্রহী হয়। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থের জোগান বাড়ালেও বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধি পায় না।
তারল্য ফাঁদের তাৎপর্য:
১. মুদ্রানীতির কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ে।
২. অর্থের জোগান বৃদ্ধি করলেও সুদের হার আর কমে না।
৩. বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান প্রত্যাশিতভাবে বৃদ্ধি পায় না।
৪. অর্থনৈতিক মন্দা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
৫. এ অবস্থায় সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি অধিক কার্যকর হয়।
৬. আধুনিক অর্থনীতিতে মন্দা মোকাবিলায় নীতিনির্ধারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
(খ) উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্বের তাৎপর্য
মার্ক্সের মতে, শ্রমিক তার শ্রমের মাধ্যমে যে মূল্য সৃষ্টি করে, তার একটি অংশ মজুরি হিসেবে পায় এবং অবশিষ্ট অংশ পুঁজিপতি লাভ হিসেবে আত্মসাৎ করে। এই অতিরিক্ত অংশই উদ্বৃত্ত মূল্য।
উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্বের তাৎপর্য:
১. পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক শোষণের প্রকৃত কারণ ব্যাখ্যা করে।
২. পুঁজিপতির মুনাফার উৎস স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
৩. শ্রেণিসংঘাতের অর্থনৈতিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করে।
৪. শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জোরদার করে।
৫. সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক চিন্তার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৬. আয় ও সম্পদের বৈষম্য বিশ্লেষণে এখনও এ তত্ত্ব প্রাসঙ্গিক।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, কেইনসের তারল্য ফাঁদ তত্ত্ব অর্থনৈতিক মন্দা ও মুদ্রানীতির সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে মার্ক্সের উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় শ্রমিকের শোষণ ও বৈষম্যের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তাই অর্থনীতির তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় ক্ষেত্রেই এই দুটি তত্ত্বের গুরুত্ব আজও অপরিসীম।
