ভূমিকা
আধুনিক ব্যবসায় ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনার গুরুত্ব অপরিসীম। আর এই পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান আর্থিক রূপ হলো বাজেট। বাজেট মূলত একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের (সাধারণত এক মাস, এক ত্রৈমাসিক বা এক বছর) সম্ভাব্য আয় ও ব্যয়ের পূর্বানুমান। এটি ব্যবসায়ের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে, যা প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে দিকনির্দেশনা প্রদান করে এবং অপচয় রোধে সাহায্য করে।
বাজেট কী?
সহজ কথায়, বাজেট হলো একটি নির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ সময়ের পরিকল্পনা যা সংখ্যা বা অর্থের অঙ্কে প্রকাশ করা হয়।
ব্যবসায়ে সফল হতে হলে নগদ অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে জরুরি। আর এর জন্য যে বাজেট তৈরি করা হয়, তাকে নগদ বাজেট (Cash Budget) বলে। নগদ বাজেট একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য নগদ প্রাপ্তি (Cash Receipts) এবং নগদ প্রদানের (Cash Disbursements) একটি পূর্বানুমান। এর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিষ্ঠানে নগদ অর্থের কোনো ঘাটতি (Deficit) বা উদ্বৃত্ত (Surplus) হবে কিনা, তা আগে থেকেই নির্ধারণ করা।
নগদ বাজেট তৈরির ধাপসমূহ
একটি নিখুঁত ও কার্যকর নগদ বাজেট তৈরি করার জন্য সাধারণত নিম্নলিখিত ধাপসমূহ অনুসরণ করা হয়:
১. সময়কাল নির্ধারণ (Determining the Budget Period)
নগদ বাজেট তৈরির প্রথম ধাপ হলো এর সময়সীমা নির্দিষ্ট করা। এটি সাধারণত এক মাস, তিন মাস (ত্রৈমাসিক) বা এক বছরের জন্য তৈরি করা হতে পারে। ব্যবসায়ের ধরন এবং নগদ প্রবাহের ওঠানামার ওপর ভিত্তি করে এই সময়কাল নির্ধারণ করা হয়।
২. প্রারম্ভিক নগদ তহবিল নির্ধারণ (Identifying Beginning Cash Balance)
বাজেট মেয়াদের শুরুতে প্রতিষ্ঠানের হাতে বা ব্যাংকে ঠিক কত টাকা নগদ আছে (Opening Cash Balance), তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হয়। পরবর্তী ধাপগুলোর হিসাব এই প্রারম্ভিক জেরের ওপর ভিত্তি করেই শুরু হয়।
৩. নগদ প্রাপ্তির পূর্বাভাস (Forecasting Cash Receipts)
এই ধাপে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্ভাব্য সব উৎস থেকে মোট কত নগদ অর্থ আসতে পারে, তার হিসাব করা হয়। নগদ প্রাপ্তির প্রধান উৎসগুলো হলো:
নগদ বিক্রয়
দেনাদার বা প্রাপ্য হিসাব থেকে টাকা আদায়
স্থায়ী সম্পত্তি বিক্রয় থেকে প্রাপ্তি
শেয়ার বা ঋণপত্র ইস্যুর মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ
৪. নগদ প্রদানের পূর্বাভাস (Forecasting Cash Disbursements)
প্রতিষ্ঠান থেকে কোন কোন খাতে নগদ অর্থ চলে যাবে, তার একটি নিখুঁত তালিকা এবং পরিমাণ এই ধাপে তৈরি করা হয়। নগদ প্রদানের প্রধান খাতগুলো হলো:
কাঁচামাল বা পণ্য ক্রয় বাবদ পরিশোধ
পাওনাদার বা প্রদেয় হিসাবের টাকা পরিশোধ
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও মজুরি প্রদান
পরিচালন ব্যয় (যেমন: ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, বিজ্ঞাপন খরচ ইত্যাদি)
স্থায়ী সম্পত্তি ক্রয় এবং লভ্যাংশ বা কর পরিশোধ
৫. নিট নগদ প্রবাহ ও সমাপনী জের নির্ণয় (Calculating Closing Cash Balance)
প্রারম্ভিক নগদ তহবিলের সাথে মোট নগদ প্রাপ্তি যোগ করা হয় এবং তা থেকে মোট নগদ প্রদান বিয়োগ করা হয়।
সূত্র: সমাপনী নগদ তহবিল = (প্রারম্ভিক নগদ তহবিল + মোট নগদ প্রাপ্তি) – মোট নগদ প্রদান
৬. ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত মূল্যায়ন (Evaluating Surplus or Deficit)
সমাপনী জের নির্ণয়ের পর দুটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে:
নগদ উদ্বৃত্ত (Surplus): যদি প্রাপ্তি, প্রদানের চেয়ে বেশি হয়। এই অতিরিক্ত অর্থ কোনো লাভজনক খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়।
নগদ ঘাটতি (Deficit): যদি প্রদান, প্রাপ্তির চেয়ে বেশি হয়। এই ক্ষেত্রে ঘাটতি মেটানোর জন্য আগে থেকেই ব্যাংক ঋণ বা অন্য কোনো উৎস থেকে অর্থ সংস্থানের ব্যবস্থা করতে হয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, নগদ বাজেট কেবল একটি কাগজের হিসাব নয়, বরং ব্যবসায়ের তারল্য (Liquidity) বজায় রাখার একটি অন্যতম চাবিকাঠি। সঠিক ধাপগুলো অনুসরণ করে তৈরি একটি নগদ বাজেট প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সঠিক পথ দেখায়। তাই যেকোনো সফল ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে একটি নির্ভুল নগদ বাজেট প্রণয়ন অপরিহার্য।


