বিক্রয়যোগ্য সিকিউরিটি কি?বিক্রয়যোগ্য সিকিউরিটির শ্রেণিবিভাগ দেখাও।

ভূমিকা
আধুনিক ব্যবসায়িক জগতে কোম্পানিগুলো তাদের অলস বা অতিরিক্ত নগদ অর্থ ফেলে না রেখে সাময়িকভাবে এমন কিছু আর্থিক দলিলে বিনিয়োগ করে, যা প্রয়োজনে খুব দ্রুত এবং সহজে বাজারে বিক্রি করে নগদে রূপান্তর করা যায়। এই ধরনের তরল আর্থিক সম্পদগুলোকে হিসাববিজ্ঞানের ভাষায় বিক্রয়যোগ্য সিকিউরিটি বা মার্কেটেবল সিকিউরিটিস বলা হয়। এগুলো সাধারণত চলতি সম্পদ (Current Assets) হিসেবে কোম্পানির উদ্বৃত্তপত্রে (Balance Sheet) দেখানো হয়।

বিক্রয়যোগ্য সিকিউরিটি কি?
সহজ কথায়, যেসব সিকিউরিটি বা আর্থিক দলিল (যেমন- শেয়ার, বন্ড, ডিবেঞ্চার ইত্যাদি) কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত সরকারি বা বেসরকারি এক্সচেঞ্জে (যেমন- শেয়ার বাজার) নিয়মিত কেনাবেচা হয় এবং এক বছরের কম সময়ের মধ্যে সামান্যতম মূল্যের ক্ষতি ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে নগদায়ন করা যায়, তাকে বিক্রয়যোগ্য সিকিউরিটি বলে।

প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

উচ্চ তরলতা: এগুলো যেকোনো সময় বাজারে বিক্রি করে নগদ টাকা পাওয়া যায়।

স্বল্পমেয়াদী প্রকৃতি: সাধারণত এক বছরের মধ্যে বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে এগুলো কেনা হয়।

সক্রিয় বাজার: এগুলো কেনাবেচার জন্য একটি প্রতিষ্ঠিত ও সক্রিয় বাজার থাকে।

কম ঝুঁকি: নগদ অর্থের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এগুলোতে ঝুঁকির পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকে।

বিক্রয়যোগ্য সিকিউরিটির শ্রেণিবিভাগ
বিনিয়োগের ধরন, উদ্দেশ্য এবং মেয়াদের ওপর ভিত্তি করে বিক্রয়যোগ্য সিকিউরিটিকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। নিচে এর বিস্তারিত শ্রেণিবিভাগ আলোচনা করা হলো:

১. ইক্যুইটি সিকিউরিটিজ (Equity Securities)
যখন কোনো কোম্পানি অন্য কোনো পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির মালিকানা বা শেয়ার ক্রয় করে এবং তা দ্রুত বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ধরে রাখে, তখন তাকে বিক্রয়যোগ্য ইক্যুইটি সিকিউরিটি বলে।

সাধারণ শেয়ার (Common Stock): পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত যেকোনো কোম্পানির সাধারণ শেয়ার, যা ব্রোকার হাউজের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে কেনাবেচা করা যায়।

অগ্রাধিকার শেয়ার (Preferred Stock): এই শেয়ারের মালিকরা নির্দিষ্ট হারে লভ্যাংশ পান এবং কোম্পানির অবসায়নের সময় সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের আগে মূলধন ফেরত পান।

২. ঋণ সিকিউরিটিজ (Debt Securities)
কোনো institution বা সরকার যখন অর্থায়নের জন্য ঋণপত্র ইস্যু করে এবং সেই ঋণপত্রগুলো যদি বাজারে সহজে কেনাবেচাযোগ্য হয়, তবে তাকে ঋণ সিকিউরিটিজ বলে। এগুলোর বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে সুদ পাওয়া যায়।

ট্রেজারি বিল (Treasury Bills): সরকার কর্তৃক ইস্যুকৃত স্বল্পমেয়াদী ঋণপত্র। এটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত এবং অত্যন্ত তরল।

বাণিজ্যিক পত্র (Commercial Paper): বড় ও নামী কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বল্পমেয়াদী অর্থায়নের জন্য এই জামানতহীন ঋণপত্র ইস্যু করে।

স্বল্পমেয়াদী বন্ড বা ডিবেঞ্চার: সরকারি বা কর্পোরেট বন্ড যার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সেকেন্ডারি মার্কেটে সহজে বিক্রি করে দেওয়া যায়।

৩. হাইব্রিড বা মিশ্র সিকিউরিটিজ (Hybrid Securities)
এই ধরনের সিকিউরিটিতে ইক্যুইটি (শেয়ার) এবং ডেট (ঋণ) উভয়েরই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকে।

রূপান্তরযোগ্য বন্ড (Convertible Bonds): এমন কিছু বন্ড বা ঋণপত্র যা বিনিয়োগকারী চাইলে নির্দিষ্ট সময় পর বা নির্দিষ্ট শর্তে সাধারণ শেয়ারে রূপান্তর করতে পারেন এবং বাজারে বিক্রি করতে পারেন।

উদ্দেশ্যভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ (GAAP/IFRS অনুযায়ী)
কোম্পানিগুলো তাদের হিসাবের বইতে দেখানোর জন্য সিকিউরিটিকে তাদের উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে আবার তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে:

ট্রেডিং সিকিউরিটিজ (Trading Securities): অতি দ্রুত (কয়েক দিন বা সপ্তাহের মধ্যে) লাভ করার উদ্দেশ্যে কেনা শেয়ার বা বন্ড।

বিক্রয়ের জন্য উপলব্ধ (Available-for-Sale / AFS): এগুলো সুনির্দিষ্টভাবে ট্রেডিং বা মেয়াদের শেষ পর্যন্ত রাখার জন্য নয়; প্রয়োজনে যেকোনো সময় বিক্রি করা হতে পারে।

মেয়াদপূর্তি পর্যন্ত ধর্তব্য (Held-to-Maturity / HTM): যেসব ঋণ সিকিউরিটি মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোম্পানি নিজের কাছে রেখে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়।

উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, বিক্রয়যোগ্য সিকিউরিটি হলো একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনার অত্যন্ত কার্যকর একটি হাতিয়ার। অলস মূলধনকে অলস না রেখে আয় করা এবং একই সাথে প্রয়োজনের সময় যেন নগদ টাকার ঘাটতি না হয়—এই দুইয়ের চমৎকার ভারসাম্য রক্ষা করে বিক্রয়যোগ্য সিকিউরিটি। সঠিক সিকিউরিটি নির্বাচন কোম্পানির মুনাফা অর্জন এবং তারল্য (Liquidity) বজায় রাখতে প্রধান ভূমিকা পালন করে।