ভূমিকা
একটি ব্যবসায়ের আর্থিক অবস্থা সঠিকভাবে মূল্যায়নের জন্য শুধু লাভ-ক্ষতির হিসাব জানাই যথেষ্ট নয়, বরং প্রতিষ্ঠানে কী পরিমাণ নগদ অর্থের আগমন ও নির্গমন ঘটছে তা জানাও আবশ্যক। লাভ-ক্ষতি বিবরণী সাধারণত বকেয়া ভিত্তির (Accrual Basis) ওপর তৈরি হয়, যা প্রকৃত নগদ তহবিলের চিত্র দেখায় না। একটি নির্দিষ্ট হিসাবকালে ব্যবসায়ের নগদ অর্থের উৎস এবং ব্যবহারের বাস্তব চিত্র যে বিবরণীর মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, তাকে নগদ প্রবাহ বিবরণী বলা হয়। এটি ব্যবসায়ের তারল্য ও আর্থিক স্বচ্ছলতা বজায় রাখতে পরিচালকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করে।
নগদ প্রবাহ বিবরণী কী?
সহজ কথায়, যে আর্থিক বিবরণীতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত এক বছর বা এক মাস) ব্যবসায়ের নগদ ও নগদ সমজাতীয় অর্থের (Cash and Cash Equivalents) মোট আগমন (Inflow) এবং মোট নির্গমন (Outflow) লিপিবদ্ধ করা হয়, তাকে নগদ প্রবাহ বিবরণী বলে।
আন্তর্জাতিক হিসাবমান-৭ (IAS-7) অনুযায়ী, একটি প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রবাহকে প্রধানত তিনটি ভাগে বা কার্যক্রমে বিভক্ত করে এই বিবরণী প্রস্তুত করা হয়:
১. পরিচালন কার্যক্রম (Operating Activities): ব্যবসায়ের মূল বা দৈনন্দিন আয়-ব্যয় সংক্রান্ত নগদ প্রবাহ (যেমন: পণ্য বিক্রয় থেকে প্রাপ্তি, পাওনাদার ও কর্মচারীদের পরিশোধ)।
২. বিনিয়োগ কার্যক্রম (Investing Activities): স্থায়ী সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ সংক্রান্ত নগদ প্রবাহ (যেমন: জমি, যন্ত্রপাতি ক্রয় বা বিক্রয়)।
৩. অর্থসংস্থান কার্যক্রম (Financing Activities): ব্যবসায়ের মূলধন ও ঋণ সংক্রান্ত নগদ প্রবাহ (যেমন: শেয়ার ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ, ব্যাংক ঋণ গ্রহণ বা পরিশোধ, এবং লভ্যাংশ প্রদান)।
নগদ প্রবাহ বিবরণী তৈরির পদ্ধতিসমূহ
নগদ প্রবাহ বিবরণী সাধারণত দুটি প্রধান পদ্ধতিতে তৈরি করা যায়। পদ্ধতি দুটি মূলত পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন, তবে বিনিয়োগ ও অর্থসংস্থান কার্যক্রমের ক্ষেত্রে উভয় পদ্ধতিতেই নিয়ম একই থাকে।
১. প্রত্যক্ষ পদ্ধতি (Direct Method)
প্রত্যক্ষ পদ্ধতিতে পরিচালন কার্যক্রমের অন্তর্গত প্রতিটি খাত থেকে প্রকৃত নগদ প্রাপ্তি এবং নগদ পরিশোধগুলো সরাসরি প্রদর্শন করা হয়। এই পদ্ধতিতে কোনো অবাস্তব বা অনগদ লেনদেন (যেমন: অবচয়) অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।
পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ নির্ণয়:
নগদ প্রাপ্তি: গ্রাহকদের কাছ থেকে নগদ আদায়, সেবা আয় থেকে নগদ প্রাপ্তি ইত্যাদি।
নগদ পরিশোধ: সরবরাহকারীকে (পাওনাদার) পরিশোধ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন প্রদান, পরিচালন খরচ ও কর বাবদ নগদ পরিশোধ।
নগদ প্রাপ্তি থেকে নগদ পরিশোধ বাদ দিলে “পরিচালন কার্যক্রম থেকে নিট নগদ প্রবাহ” পাওয়া যায়।
সুবিধা: এই পদ্ধতিটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং এর মাধ্যমে জানা যায় ঠিক কোন খাত থেকে কত নগদ টাকা এলো এবং কোথায় গেল।
২. পরোক্ষ পদ্ধতি (Indirect Method)
বাস্তব ক্ষেত্রে পরোক্ষ পদ্ধতিটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় এবং বহুল ব্যবহৃত। এই পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানের নিট লাভ বা ক্ষতি (Net Income) থেকে শুরু করা হয় এবং পরবর্তীতে এর সাথে বিভিন্ন অনগদ খরচ ও চলতি সম্পদের পরিবর্তন সমন্বয় করে পরিচালন নগদ প্রবাহ বের করা হয়।
পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ নির্ণয় (সমন্বয়সমূহ):
অনগদ খরচ যোগ: অবচয় (Depreciation) এবং অবলোপন (Amortization)-এর মতো অনগদ খরচগুলো নিট লাভের সাথে যোগ করা হয় (কারণ এগুলো মুনাফা কমিয়েছে কিন্তু নগদ টাকা ব্যবসা থেকে যায়নি)।
স্থায়ী সম্পত্তি বিক্রয়জনিত লাভ/ক্ষতি: স্থায়ী সম্পত্তি বিক্রয়জনিত ক্ষতি যোগ এবং লাভ বিয়োগ করা হয়।
চলতি সম্পদের পরিবর্তন: চলতি সম্পদ (যেমন: দেনাদার, মজুদ পণ্য) বৃদ্ধি পেলে বিয়োগ এবং হ্রাস পেলে যোগ করা হয়।
চলতি দায়ের পরিবর্তন: চলতি দায় (যেমন: পাওনাদার, বকেয়া খরচ) বৃদ্ধি পেলে যোগ এবং হ্রাস পেলে বিয়োগ করা হয়।
এই সমন্বয়গুলোর পর “পরিচালন কার্যক্রম থেকে নিট নগদ প্রবাহ” পাওয়া যায়।
বিনিয়োগ ও অর্থসংস্থান কার্যক্রম (উভয় পদ্ধতির জন্য এক)
বিনিয়োগ কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ:
স্থায়ী সম্পত্তি ও বিনিয়োগ বিক্রয় থেকে প্রাপ্তি (যোগ)।
স্থায়ী সম্পত্তি ও বিনিয়োগ ক্রয় বাবদ পরিশোধ (বিয়োগ)।
অর্থসংস্থান কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ:
শেয়ার বা বন্ড ইস্যু এবং ব্যাংক থেকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ গ্রহণ (যোগ)।
ঋণ বা বন্ডের আসল টাকা পরিশোধ এবং লভ্যাংশ প্রদান (বিয়োগ)।
সর্বশেষ ধাপ: এই তিনটি কার্যক্রমের নিট ফলাফল যোগ করে বছরের “নিট নগদ বৃদ্ধি বা হ্রাস” বের করা হয়। এর সাথে বছরের প্রারম্ভিক নগদ তহবিল যোগ করলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বছরের সমাপনী নগদ তহবিলের সমান হয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, নগদ প্রবাহ বিবরণী হলো একটি ব্যবসায়ের আর্থিক আয়না। কোনো প্রতিষ্ঠান কাগজে-কলমে বা লাভ-ক্ষতি বিবরণীতে অনেক লাভজনক দেখালেও, পর্যাপ্ত নগদ অর্থের অভাবে সেটি দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। নগদ প্রবাহ বিবরণী তৈরির এই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পদ্ধতিগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত তারল্য অবস্থা জানা যায়। ফলে বিনিয়োগকারী, পাওনাদার এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপকগণ প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা এবং লভ্যাংশ প্রদানের সামর্থ্য সম্পর্কে নিখুঁত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।


