ব্যবসায় ঋণের ব্যয় কী? ব্যবসায় ঋণের ব্যয় কে বহন করে?

ভূমিকা
আধুনিক ব্যবসায়িক অর্থায়নে ঋণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল ব্যবহৃত উৎস। নিজস্ব পুঁজি বা শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে পর্যাপ্ত মূলধন সংগ্রহ করা সম্ভব না হলে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ঋণপত্র ইস্যুর মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করে। তবে এই বাহ্যিক তহবিল বা ঋণ বিনামূল্যে পাওয়া যায় না। ঋণ গ্রহণের ফলে প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত কিছু অতিরিক্ত আর্থিক দায়িত্ব বা খরচ বহন করতে হয়, যা ব্যবসায়ের মুনাফা এবং আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সরাসরি প্রভাবিত করে। অর্থায়নের ভাষায় একেই ব্যবসায় ঋণের ব্যয় বলা হয়।

ব্যবসায় ঋণের ব্যয় (Concept of Cost of Debt)
সহজ কথায়, কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বাহ্যিক কোনো উৎস থেকে ঋণ হিসেবে যে তহবিল সংগ্রহ করে, তার বিপরীতে পাওনাদার বা ঋণদাতাকে ক্ষতিপূরণ বা মূল্য হিসেবে যে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হয়, তাকেই ঋণের ব্যয় বলে। ফিন্যান্সের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ব্যয়ের রূপটি কেবল সাধারণ সুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে আরও কিছু আনুষঙ্গিক বিষয় জড়িত থাকে।

প্রথমত, ঋণের ব্যয়ের মূল ও প্রধান অংশ হলো নির্দিষ্ট সুদের হার। ঋণ চুক্তির শর্তানুযায়ী প্রতি বছর বা নির্দিষ্ট সময় পর পর মূল টাকার ওপর এই সুদ পরিশোধ করতে হয়। এটি প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি বাধ্যতামূলক খরচ, যা ব্যবসায় লাভ হোক বা লোকসান—উভয় অবস্থাতেই পরিশোধ করতে হয়।

দ্বিতীয়ত, ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়ার সাথে কিছু আনুষঙ্গিক খরচ বা উত্তরণ ব্যয় জড়িত থাকে। যেমন—ব্যাংকের প্রসেসিং ফি, আইনি দলিলাদির খরচ, স্ট্যাম্প ডিউটি, বন্ধকি সম্পত্তি মূল্যায়নের ফি ইত্যাদি। এই খরচগুলোও ঋণের প্রাথমিক ব্যয়কে বাড়িয়ে দেয়।

তৃতীয়ত, ঋণের ব্যয়ের সবচেয়ে ইতিবাচক এবং গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ‘কর সাশ্রয়ী সুবিধা’। প্রচলিত কর আইন অনুযায়ী, একটি ব্যবসায়ের নিট আয়ের ওপর কর ধার্য করার আগে ঋণের সুদকে পরিচালন ব্যয় হিসেবে আয় থেকে বাদ দেওয়া যায়। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের করযোগ্য আয় কমে যায় এবং সরকারকে কম কর দিতে হয়। এই কর সাশ্রয়ের কারণে ঋণের প্রকৃত বা কার্যকর ব্যয় সবসময় ব্যাংক বা চুক্তিপত্রের সুদের হারের চেয়ে বেশ খানিকটা কম হয়ে থাকে।

ব্যবসায় ঋণের ব্যয় কে বহন করে?
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে ঋণ নিয়েছে, অর্থাৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটিই কেবল এই ব্যয় বহন করে। কিন্তু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঋণের সুদের এই খরচের বোঝা বা প্রভাব বিভিন্ন পক্ষের ওপর আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে স্থানান্তরিত হয়। মূলত নিচের পক্ষগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই ব্যয় বহন করে:

ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (The Business Entity)
আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক দিক থেকে ঋণের ব্যয় সরাসরি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকেই বহন করতে হয়। ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে অর্জিত পরিচালন মুনাফা থেকে প্রতি মাসে বা নির্দিষ্ট মেয়াদে সুদের অর্থ কেটে নেওয়া হয়। এটি ব্যবসায়ের একটি স্থায়ী দায়। যদি ব্যবসায় মন্দা বা লোকসানও হয়, তাও প্রতিষ্ঠানকে তার মূল সম্পদ বা তহবিল থেকে এই সুদের টাকা পরিশোধ করতে হয়।

সাধারণ শেয়ারহোল্ডার বা মালিকপক্ষ (Shareholders)
ব্যবসায়ের প্রকৃত মালিক হলেন সাধারণ শেয়ারহোল্ডারগণ। ঋণের সুদ পরিশোধ করার পর যে অবশিষ্ট মুনাফা থাকে, তা মূলত মালিকপক্ষের প্রাপ্য। ব্যবসায়ে ঋণের পরিমাণ এবং সুদের ব্যয় যত বেশি হবে, মালিকদের জন্য নিট মুনাফার পরিমাণ তত কমে যাবে। যদি এই ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না হতো, তবে এই অর্থ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে লভ্যাংশ হিসেবে বণ্টন করা যেত অথবা ব্যবসায়ের সম্প্রসারণে ব্যবহার করা যেত। অতএব, মুনাফা কমে যাওয়ার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে মালিকপক্ষই এই ঋণের ব্যয় বহন করে।

চূড়ান্ত ভোক্তা বা ক্রেতাসাধারণ (Consumers)
মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে অনেক সময় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ঋণের ব্যয় বা সুদের খরচ পণ্য বা সেবার মূল্যের সাথে যুক্ত করে দেয়। পণ্য উৎপাদন বা সেবা প্রদানের মোট খরচ হিসাব করার সময় এই আর্থিক ব্যয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। চূড়ান্তভাবে ক্রেতা বা ভোক্তারা যখন বর্ধিত মূল্যে সেই পণ্য কেনেন, তখন প্রকারান্তরে ঋণের ব্যয়ের বোঝাটি তাদের ওপরেই গিয়ে পড়ে।

সরকার বা রাষ্ট্র (Government)
ঋণের সুদের ব্যয়ের একটি অংশ পরোক্ষভাবে দেশের সরকার তথা রাষ্ট্র বহন করে। যেহেতু ঋণের সুদ কর-বাদযোগ্য খরচ, তাই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সুদের সমপরিমাণ টাকার ওপর সরকারকে কর দেওয়া থেকে রেহাই পায়। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হ্রাস পায়। সরকার যে পরিমাণ কর ছাড় দিচ্ছে, ফিন্যান্সের দৃষ্টিতে সেটি সরকারের পক্ষ থেকে ঋণের ব্যয় ভাগ করে নেওয়ার সামিল।

উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ব্যবসায় ঋণের ব্যয় কেবল একটি একক খরচ নয়, বরং এটি ব্যবসায়ের আর্থিক কাঠামোর সাথে যুক্ত একটি বহুমাত্রিক উপাদান। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরাসরি এই অর্থ পরিশোধ করলেও এর প্রভাব মালিকপক্ষ, সাধারণ ক্রেতা এবং পরোক্ষভাবে সরকারের রাজস্বের ওপর পড়ে। তাই একটি ব্যবসায়ের স্থায়িত্ব ও প্রবৃদ্ধির জন্য ঋণের ব্যয় সুনিপুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। ব্যবসায়ের বিনিয়োগ থেকে আয়ের হার যেন সর্বদা ঋণের এই কার্যকর ব্যয়ের চেয়ে বেশি থাকে, তা নিশ্চিত করাই আর্থিক ব্যবস্থাপকের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।