ICAB কি? এর কার্যাবলিসমূহ সংক্ষেপে লিখ।

ভূমিকা
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে দক্ষ হিসাববিজ্ঞানীদের ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশে উচ্চমানের পেশাদার হিসাববিজ্ঞানী তৈরি, আর্থিক নিরীক্ষার মানদণ্ড নির্ধারণ এবং এই পেশাকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে ICAB গঠিত হয়। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং করপোরেট সুশাসন (Corporate Governance) বজায় রাখতে এই প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে।

ICAB-এর পরিচিতি
ICAB-এর পূর্ণরূপ হলো The Institute of Chartered Accountants of Bangladesh।

প্রতিষ্ঠা: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী দিকনির্দেশনায় ১৯৭৩ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নম্বর ২ (The Bangladesh Chartered Accountants Order, 1973)-এর অধীনে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

মন্ত্রণালয়: এটি বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা।

সদস্যপদ: আইসিএবি-এর সদস্যবৃন্দ ‘চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট’ (CA) হিসেবে পরিচিত হন এবং নামের শেষে ACA (Associate) বা FCA (Fellow) পদবি ব্যবহার করেন।

ICAB-এর প্রধান কার্যাবলিসমূহ
বাংলাদেশের হিসাববিজ্ঞান ও নিরীক্ষা পেশার মান উন্নয়ন এবং দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা রক্ষায় ICAB মূলত নিম্নোক্ত কার্যাবলি সম্পাদন করে থাকে:

১. শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণ প্রদান
ICAB বাংলাদেশে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি (CA) শিক্ষার পাঠ্যক্রম নির্ধারণ, নিবন্ধন এবং আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষা গ্রহণ করে থাকে। শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি নিবন্ধিত অডিট ফার্মগুলোর অধীনে বাধ্যতামূলক প্র্যাকটিক্যাল বা আর্টিকেলশিপ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে।

২. নিরীক্ষা ও হিসাববিজ্ঞানের মানদণ্ড নির্ধারণ
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সংগতি রেখে ICAB বাংলাদেশে IFRS (International Financial Reporting Standards) এবং ISA (International Standards on Auditing) এর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে। এর ফলে বাংলাদেশের আর্থিক বিবরণীগুলো বিশ্ববাজারে গ্রহণযোগ্যতা পায়।

৩. সদস্য ও অডিট ফার্মগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও লাইসেন্স প্রদান
সফলভাবে কোর্স সম্পন্নকারীদের সদস্যপদ প্রদান এবং স্বাধীনভাবে অডিট বা নিরীক্ষা প্র্যাকটিস করার জন্য COP (Certificate of Practice) বা লাইসেন্স ইস্যু করে ICAB।

৪. পেশাগত আচরণ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা
সদস্যদের জন্য কঠোর নৈতিক আচরণবিধি (Code of Ethics) প্রণয়ন করে প্রতিষ্ঠানটি। কোনো সদস্য বা ফার্ম যদি পেশাগত অসদাচরণ বা জালিয়াতির সাথে যুক্ত হয়, তবে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা সদস্যপদ বাতিলের ক্ষমতা ICAB-এর রয়েছে।

৫. DVS (Document Verification System) পরিচালনা
আর্থিক খাতের বড় একটি সংস্কার হিসেবে ICAB চালু করেছে DVS। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এবং অন্যান্য অংশীজনরা সহজেই যাচাই করতে পারেন যে কোনো কোম্পানির অডিট রিপোর্টটি আসল এবং নিবন্ধিত CA দ্বারা প্রত্যয়িত কি না। এটি জাল অডিট রিপোর্ট ও কর ফাঁকি রোধে বড় ভূমিকা রাখছে।

৬. সরকারকে নীতিগত পরামর্শ প্রদান
জাতীয় বাজেট প্রণয়ন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর নীতি নির্ধারণ, কোম্পানি আইন সংস্কার এবং দেশের আর্থিক খাতের বিভিন্ন আইন প্রণয়নে ICAB বাংলাদেশ সরকারকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশেষজ্ঞ মতামত ও পরামর্শ দিয়ে থাকে।

৭. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা
আন্তর্জাতিক হিসাববিজ্ঞান সংস্থা যেমন—IFAC (International Federation of Accountants), CAPA (Confederation of Asian and Pacific Accountants) এবং SAFA (South Asian Federation of Accountants)-এর সক্রিয় সদস্য হিসেবে ICAB বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের হিসাববিজ্ঞান পেশার প্রতিনিধিত্ব করে।

উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ICAB কেবল একটি সনদ প্রদানকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নয়, বরং এটি বাংলাদেশের আর্থিক খাতের অতন্দ্র প্রহরী। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং খাত ও রাজস্ব আহরণে স্বচ্ছতা আনয়নে প্রতিষ্ঠানটি অনবদ্য অবদান রেখে চলেছে। দক্ষ ও সৎ পেশাদার মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে ICAB-এর ভূমিকা অপরিসীম ও অনস্বীকার্য।