পার্থিব রাষ্ট্র ও বিধাতার রাষ্ট্র সম্পর্কে সেন্ট অগাস্টিনের মতবাদ ব্যাখ্যা কর।

ভূমিকা
মধ্যযুগীয় শ্রেষ্ঠ ধর্মতত্ত্ববিদ ও রাজনৈতিক দার্শনিক সেন্ট অগাস্টিন তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘The City of God’-এ মানব সমাজকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন। রোম সাম্রাজ্যের পতনকালীন অস্থিরতায় তিনি খ্রিস্টধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ এবং মানুষের জাগতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই দ্বৈত রাষ্ট্রতত্ত্ব প্রদান করেন। তাঁর মতে, মানবজাতির ইতিহাস মূলত এই দুই নগরীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও সহাবস্থানের ইতিহাস।

২. পার্থিব রাষ্ট্র (The Earthly City)
সেন্ট অগাস্টিন পার্থিব রাষ্ট্র বা জাগতিক নগরীকে মানুষের পাপ ও স্বার্থপরতার প্রতিফলন হিসেবে দেখেছেন। এর মূল দিকগুলো হলো:

ভিত্তি: পার্থিব রাষ্ট্র আত্মপ্রেম (Self-love) এবং ঈশ্বরকে অবজ্ঞা করার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এখানে মানুষ নিজের সুখ, বিলাসিতা এবং ক্ষমতার মোহে মত্ত থাকে।

চরিত্র: এই রাষ্ট্র মূলত দম্ভ, কলহ এবং যুদ্ধের প্রতীক। এখানে শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক আধিপত্য বিস্তারের ওপর নির্ভরশীল।

অস্থায়িত্ব: যেহেতু পার্থিব রাষ্ট্র মানুষের নশ্বর কামনা-বাসনার ওপর নির্মিত, তাই এটি চিরস্থায়ী নয়। অগাস্টিনের মতে, পৃথিবীর বড় বড় সাম্রাজ্য (যেমন রোম) এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ, যা সময়ের পরিক্রমায় ধ্বংস হয়ে যায়।

প্রয়োজনীয়তা: পাপের ফসল হলেও জাগতিক শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য পার্থিব রাষ্ট্রের প্রয়োজন রয়েছে। এটি মানুষের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

৩. বিধাতার রাষ্ট্র (The City of God)
বিধাতার রাষ্ট্র বা ঈশ্বরের নগরী কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়, বরং এটি একটি চিরন্তন আধ্যাত্মিক সমাজ। এর বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

ভিত্তি: এই রাষ্ট্র ঈশ্বরপ্রেম (Love of God) এবং আত্মত্যাগের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে মানুষ নিজেকে ঈশ্বরের চরণে উৎসর্গ করে এবং তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে।

নাগরিকত্ব: যারা প্রকৃত বিশ্বাসী, সৎ এবং ধার্মিক, তারাই এই নগরের নাগরিক। অগাস্টিন মনে করেন, পৃথিবীর সকল খ্রিস্টান বা চার্চের সকল সদস্যই এর অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং কেবলমাত্র যাদের আত্মা পবিত্র তারাই এর অংশ।

লক্ষ্য ও শান্তি: এই রাষ্ট্রের পরম লক্ষ্য হলো স্বর্গীয় শান্তি অর্জন। এখানে কোনো সংঘাত নেই, আছে কেবল ভ্রাতৃত্ব এবং ঈশ্বরভক্তি।

অবিনশ্বরতা: বিধাতার রাষ্ট্র শাশ্বত ও অমর। জাগতিক কোনো বিপর্যয় বা পতন একে স্পর্শ করতে পারে না।

৪. দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক
অগাস্টিনের মতে, বর্তমানে পৃথিবীতে এই দুই রাষ্ট্র একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। তারা একই সম্পদ ব্যবহার করে এবং একই আলো-বাতাসে বাস করে। তবে তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন।

পার্থিব রাষ্ট্র দেহ বা জাগতিক চাহিদার ওপর গুরুত্ব দেয়, আর বিধাতার রাষ্ট্র আত্মার মুক্তির ওপর জোর দেয়। অগাস্টিন মনে করতেন, যতক্ষণ পর্যন্ত শেষ বিচারের দিন (Last Judgment) না আসছে, ততক্ষণ এই দুই ধারার মানুষকে বাহ্যিকভাবে আলাদা করা কঠিন। তবে শেষ পর্যন্ত পার্থিব রাষ্ট্রের পতন ঘটবে এবং বিধাতার রাষ্ট্রই জয়যুক্ত হবে।

উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, সেন্ট অগাস্টিনের এই মতবাদটি ছিল সমকালীন রাজনৈতিক সংকটের একটি আধ্যাত্মিক সমাধান। তিনি রাষ্ট্রকে চার্চের অধীনে আনার বা নৈতিকভাবে উন্নত করার তাগিদ দিয়েছেন। তাঁর এই দর্শনের মাধ্যমেই মধ্যযুগে রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যকার সম্পর্কের ভিত্তি রচিত হয়েছিল, যা আজও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।