ভূমিকা
ইবনে খালদুনই প্রথম ঐতিহাসিক যিনি ইতিহাসের গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তনের পেছনে কার্যকারণ সম্পর্ক অনুসন্ধান করেছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র কোনো স্থবির প্রতিষ্ঠান নয়; বরং এটি একটি জীবন্ত সত্তার মতো জন্মায়, বিকশিত হয় এবং পরিশেষে মৃত্যুবরণ করে। তিনি মূলত ‘আসাবিয়াহ’ (যৌথ চেতনা বা গোষ্ঠী সংহতি) ধারণার ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রের এই উত্থান-পতনের চক্র ব্যাখ্যা করেছেন।
১. আসাবিয়াহ (Asabiyyah) বা গোষ্ঠী সংহতি
ইবনে খালদুনের দর্শনের মূল ভিত্তি হলো আসাবিয়াহ। এটি এমন এক সামাজিক বন্ধন বা ঐক্যবোধ যা একটি গোষ্ঠীকে শক্তিশালী করে। মরুভূমির যাযাবরদের (বদউইন) মধ্যে এই সংহতি অত্যন্ত প্রবল থাকে। এই আসাবিয়াহর শক্তিতেই একটি গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীকে পরাজিত করে ক্ষমতা দখল করে এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে।
২. রাষ্ট্রের বিবর্তনের পাঁচটি স্তর
ইবনে খালদুন একটি রাষ্ট্রের আয়ুষ্কালকে সাধারণত তিন পুরুষের (প্রায় ১২০ বছর) মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন এবং একে পাঁচটি স্তরে বিভক্ত করেছেন:
প্রতিষ্ঠার স্তর (The Stage of Conquest): এই স্তরে একটি গোষ্ঠী তাদের প্রবল ‘আসাবিয়াহ’ বা সংহতির মাধ্যমে অন্য শক্তিকে পরাজিত করে ক্ষমতা দখল করে। এখানে শাসক ও শাসিতের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকে না এবং সরলতা বজায় থাকে।
স্বৈরাচারী বা একনায়কত্বের স্তর (The Stage of Absolutism): ক্ষমতা স্থায়ী হওয়ার পর শাসক নিজের কর্তৃত্ব সুসংহত করতে চান। তিনি তাঁর স্বগোত্রীয়দের সরিয়ে অনুগত বেতনভুক্ত বাহিনী গঠন করেন এবং ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করেন।
বিলাসিতা ও সমৃদ্ধির স্তর (The Stage of Prosperity): এ পর্যায়ে রাষ্ট্রে শান্তি ও সমৃদ্ধি আসে। শাসক অট্টালিকা নির্মাণ, শিল্পকলা এবং আরাম-আয়েশে মনোনিবেশ করেন। রাজস্ব বৃদ্ধি পায় এবং জনকল্যাণমূলক কাজ হয়।
তুষ্টি ও অলসতার স্তর (The Stage of Contentment): এ স্তরে শাসক ও তাঁর উত্তরাধিকারীরা পূর্বপুরুষদের অর্জনে সন্তুষ্ট থাকেন। তারা নতুন কিছু করার চেষ্টা করেন না এবং অলসতায় মগ্ন হন। আসাবিয়াহ বা গোষ্ঠী সংহতি শিথিল হতে শুরু করে।
পতন ও বিলুপ্তির স্তর (The Stage of Decay): এটি শেষ পর্যায়। শাসক গোষ্ঠী চরম বিলাসিতায় মগ্ন হয়ে পড়ে এবং অতিরিক্ত কর আরোপের ফলে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়। সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে যায়। ফলে বাইরে থেকে কোনো শক্তিশালী ‘আসাবিয়াহ’ সম্পন্ন গোষ্ঠী এসে এই জীর্ণ রাষ্ট্রকে আঘাত করে এবং নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩. যাযাবর ও স্থায়ী সভ্যতার দ্বন্দ্ব
ইবনে খালদুন দেখিয়েছেন যে, মরুভূমির যাযাবরদের মধ্যে কঠোর পরিশ্রমী ও ঐক্যবদ্ধ থাকার মানসিকতা থাকে। কিন্তু যখন তারা জয়ী হয়ে শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে, তখন তারা ধীরে ধীরে আরাম-প্রিয় হয়ে পড়ে। এই আরাম-প্রিয়তাই তাদের পতন ত্বরান্বিত করে।
৪. রাষ্ট্রের আয়ুষ্কাল
ইবনে খালদুন মনে করতেন একটি রাষ্ট্রের স্বাভাবিক আয়ু সাধারণত তিন প্রজন্ম।
প্রথম প্রজন্ম: যারা কষ্ট সহ্য করে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে।
দ্বিতীয় প্রজন্ম: যারা অর্জিত সম্পদ ভোগ করে এবং কিছুটা বিলাসিতায় মগ্ন হয়।
তৃতীয় প্রজন্ম: যারা সম্পূর্ণ অলস ও বিলাসপ্রিয় হয় এবং আসাবিয়াহ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে। এর ফলেই রাষ্ট্রের পতন ঘটে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ইবনে খালদুনের সমাজ ও রাষ্ট্রের উত্থান-পতন তত্ত্বটি অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত এবং বাস্তববাদী। তিনি ইতিহাসের চাকাকে বৃত্তাকার হিসেবে দেখেছেন, যেখানে উত্থানের মধ্যেই পতনের বীজ নিহিত থাকে। বর্তমান আধুনিক সমাজবিজ্ঞানেও তাঁর এই ‘আসাবিয়াহ’ এবং সভ্যতার বিবর্তন তত্ত্ব অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পঠিত হয়। তাঁর এই বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় যে, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সংহতি হারিয়ে ফেললে যেকোনো শক্তিশালী সভ্যতা বা রাষ্ট্রের পতন অনিবার্য।


