জন লককে সংসদীয় গণতন্ত্রের জনক বলা কেন?

ভূমিকা
সপ্তদশ শতাব্দীর ব্রিটিশ দার্শনিক জন লক (John Locke) তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারার মাধ্যমে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Two Treatises of Government’-এ তিনি ঐশ্বরিক রাজতন্ত্রের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে যুক্তি দেখান যে, রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের সম্মতি। এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত, যার কারণে তাঁকে সংসদীয় গণতন্ত্রের জনক বলা হয়।

কেন তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রের জনক:
জন লকের দর্শনে এমন কিছু মৌলিক উপাদান ছিল যা সরাসরি সংসদীয় ব্যবস্থার কাঠামো তৈরি করে:

জনগণের সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক চুক্তি: লক বিশ্বাস করতেন, ক্ষমতা রাজার ঈশ্বরদত্ত কোনো অধিকার নয়। বরং মানুষ তাদের নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য একটি ‘সামাজিক চুক্তির’ মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠন করে। সরকারের প্রকৃত উৎস হলো জনগণের সম্মতি।

ক্ষমতার বিভাজন (Separation of Powers): লকই প্রথম স্পষ্টভাবে সরকারের আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের পৃথকীকরণের কথা বলেন। তিনি মনে করতেন, আইন বিভাগ (যা আধুনিক সংসদ) হবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, যা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে।

আইনসভার শ্রেষ্ঠত্ব: সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল কথা হলো আইনসভার কাছে শাসন বিভাগের জবাবদিহিতা। লক জোর দিয়েছিলেন যে, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত আইন সভাই হবে সকল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু।

মৌলিক অধিকার রক্ষা: লক মানুষের তিনটি প্রাকৃতিক অধিকারের কথা বলেছেন— জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্পত্তি। তিনি যুক্তি দেন যে, সরকারের প্রধান কাজ হলো এই অধিকারগুলো রক্ষা করা। যদি কোনো সরকার এতে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের অধিকার আছে সেই সরকারকে পরিবর্তন বা উচ্ছেদ করার। এটিই আধুনিক গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মূল ভিত্তি।

সংখ্যালঘুর অধিকার ও পরমতসহিষ্ণুতা: লক ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যা একটি সুস্থ সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম অপরিহার্য শর্ত।

উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, জন লকের রাজনৈতিক দর্শন কেবল তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৬৮৮ সালের ইংল্যান্ডের ‘গৌরবময় বিপ্লব’ এবং পরবর্তীকালে আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা ও ফরাসি বিপ্লবে তাঁর চিন্তাধারা গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসনের যে কাঠামো তিনি প্রদান করেছিলেন, তা আজও আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি। তাই তাঁকে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রকৃত জনক হিসেবে অভিহিত করা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত।