বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুঁইমাচা’ গল্পের অন্যতম প্রধান ও ট্র্যাজিক চরিত্র হলো সহায়হরী চাটুজ্যে। তিনি কোনো মহৎ নায়ক নন, বরং গ্রামবাংলার এক হতদরিদ্র, অকর্মণ্য কিন্তু অত্যন্ত স্নেহশীল পিতার প্রতিচ্ছবি। তাঁর চরিত্রের মূল দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. চরম দারিদ্র্য ও অকর্মণ্যতা
সহায়হরী এক চরম অভাবী সংসারের কর্তা। তাঁর না আছে জোতজমা, না আছে নিয়মিত আয়। নিজের অক্ষমতার কারণে সংসারে সব সময় অনটন লেগে থাকে। অভাবের তাড়নায় তিনি মাঝে মাঝে অন্যের বাগান থেকে সবজি বা বাঁশ চুরি করতেও দ্বিধা করেন না। সমাজের চোখে তিনি একজন ‘অপদার্থ’ এবং পরিবারের কাছেও অনেক সময় লাঞ্ছনার পাত্র।
২. স্নেহশীল পিতৃত্ব
সহায়হরীর চরিত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক হলো তাঁর অপত্য স্নেহ। বিশেষ করে বড় মেয়ে খেন্তির প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অগাধ। খেন্তির খাবার প্রতি আসক্তি বা তার ছোটখাটো আবদারগুলো তিনি বুঝতেন। শত অভাবের মাঝেও মেয়ের বিয়ের জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। মেয়ের মৃত্যুর পর তাঁর যে বুকফাটা হাহাকার, তা আমাদের চোখে জল আনে।
৩. দায়িত্ববোধ ও অসহায়ত্ব
তিনি জানতেন যে তাঁর বড় মেয়ে দেখতে খুব একটা সুন্দরী নয়, তাই তার বিয়ে দেওয়া কঠিন। নিজের অভাব সত্ত্বেও তিনি জমিদারের কাছে হাত পেতে বা ধারদেনা করে মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেন। বিয়ের পর খেন্তি যখন শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতিত হচ্ছিল, তখন সহায়হরী তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু সামাজিক ও আর্থিক দৈন্যের কাছে তিনি বারবার হেরে গেছেন।
৪. ভোজনরসিক ও সরলতা
খেন্তির মতো সহায়হরী নিজেও কিছুটা ভোজনরসিক। গঞ্জের বাজার থেকে সস্তায় জিনিস কিনে আনা বা সামান্য কিছু ভালো খাবারের আয়োজনে তিনি আনন্দ খুঁজে পেতেন। তাঁর মধ্যে কোনো কপটতা নেই; বরং এক ধরনের গ্রাম্য সারল্য আছে যা তাকে পাঠকদের কাছে সহানুভূতিশীল করে তোলে।
৫. ট্র্যাজিক পরিণতি
গল্পের শেষে যখন খেন্তি মারা যায় এবং চৈত্র মাসের তপ্ত দুপুরে সহায়হরী বাড়ির উঠোনে একা বসে থাকেন, তখন তাঁর নিঃসঙ্গতা ফুটে ওঠে। খেন্তির লাগানো সেই পুঁইগাছটি যখন লকলকিয়ে বেড়ে ওঠে, তখন সহায়হরী তার মধ্যেই মৃত কন্যার স্মৃতি খুঁজে পান। মেয়ের শেষ ইচ্ছা (পুঁইমিচুরি খাওয়া) পূরণ করতে না পারার আক্ষেপ তাকে এক চিরস্থায়ী বেদনার চরিত্রে পরিণত করে।
সারসংক্ষেপ: সহায়হরী চাটুজ্যে কোনো আদর্শ পুরুষ নন, বরং পরিবেশ ও পরিস্থিতির শিকার এক সাধারণ মানুষ। তাঁর চারিত্রিক দুর্বলতাগুলো ছাপিয়ে তাঁর হৃদয়ের মমতা ও পিতৃস্নেহ তাঁকে এক চিরন্তন রূপ দান করেছে।
আমি কি আপনাকে বিভূতিভূষণের অন্য কোনো গল্পের চরিত্র বা বিষয়বস্তু বুঝতে সাহায্য করতে পারি?


