ইতিহাসের পরিধি আলোচনা কর।

অথবা, ইতিহাসের বিষয়বস্তু সম্পর্কে আলোচনা কর ।
অথবা, ইতিহাসের বিষয়বস্তু সংক্ষেপে লিখ।
উত্তর৷ ভূমিকা :

ইতিহাস একটি মহাকাব্য, মানব সমাজের অতীত ঘটনার দলিল ও অধ্যয়নের জন্য একটি গবেষণা ক্ষেত্র, যেখানে বিভিন্ন কিংবা পূর্ববর্তী ঘটনাবলী, সংঘটনা, ও ব্যক্তিত্বগুলির মধ্যে সংযোজন ও সম্পর্ক অনুসন্ধান করা হয়। ইতিহাস আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে কী ভাবে আমাদের সমাজ, সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষ্য, ও রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক আচরণ হয়েছে এবং এসবের মাধ্যমে আমরা কীভাবে এখানে পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক সত্তা, কর্মকাণ্ড, ও বীরত্ববিষয়ক কথাগুলি চিন্তা করতে পারি।


ইতিহাসের বিষয়বস্তু : ইতিহাসের আলোচ্য বিষয় ব্যাপক ও বিস্তৃত। নিচে ইতিহাসের আলোচ্য বিষয় বা বিষয়বস্তু সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো :

ইতিহাস হলো অতীতের ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিক বিবরণ। এটি কেবল যুদ্ধ, রাজা-মহারাজাদের কাহিনী নয়, বরং মানব সভ্যতার বিকাশ ও অগ্রগতির গল্প। ইতিহাসের বিষয়বস্তুকে মোটামুটিভাবে নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করা যায়:

1. রাষ্ট্রীয় ইতিহাস:

  • রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও বিকাশ
  • রাজবংশ ও রাজাদের ইতিহাস
  • রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও শাসন প্রণালী
  • যুদ্ধ ও বিজয়
  • আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

2. সামাজিক ইতিহাস:

  • সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী ও তাদের জীবনযাত্রা
  • পারিবারিক ও সামাজিক রীতিনীতি
  • শিক্ষা ব্যবস্থা
  • ধর্ম ও বিশ্বাস
  • সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য

3. অর্থনৈতিক ইতিহাস:

  • কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের বিকাশ
  • অর্থনৈতিক ব্যবস্থা
  • মুদ্রা ব্যবস্থা
  • জীবিকা নির্বাহের উপায়

4. সাংস্কৃতিক ইতিহাস:

  • সাহিত্য, শিল্প, স্থাপত্য, সঙ্গীত, নৃত্য ইত্যাদির বিকাশ
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি
  • দর্শন ও চিন্তাধারার বিকাশ

5. ধর্মীয় ইতিহাস:

  • বিভিন্ন ধর্মের উৎপত্তি ও বিকাশ
  • ধর্মীয় রীতিনীতি ও বিশ্বাস
  • ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিত্ব

6. বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত ইতিহাস:

  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন শাখার বিকাশ
  • গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও উদ্ভাবন
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রভাব

উল্লেখ্য যে, ইতিহাসের বিষয়বস্তু স্থির নয়। সময়ের সাথে সাথে নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কার হওয়ায় ইতিহাসের জ্ঞানের পরিধিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।


১. মানুষের উদ্ভব ও বিকাশ : “ইতিহাস মানুষের অতীতের কার্যাবলির বিবরণ করে। এটি মানুষের সৃষ্টির রহস্য, উদ্ভব, এবং ক্রমবিকাশের সমগ্র অভিযানকে প্রতিষ্ঠান করে থাকে। মানুষের জীবনের এই গভীর অংশটি ইতিহাসের আলোচ্য বিষয় হিসেবে প্রকাশ পায়।”
২. সভ্যতার উদ্ভব ও বিকাশ : “সৃষ্টির পর, মানুষের বসবাসের জন্য উপযোগী পৃথিবীতে, যুগে যুগে বিভিন্ন সভ্যতার উদ্ভব, বিকাশ, চরমোৎকর্ষ, এবং পতন ঘটেছে। এই প্রস্তুতি ও অবনতির পথে ইতিহাস সভ্যতার বিভিন্ন দক্ষতা, সাংস্কৃতিক প্রবর্তন, এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করে।”
৩. কাল বিভাজন : “সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত, মানুষ ও সভ্যতা নিয়ে পৃথিবীতে এক দীর্ঘ পথপরিক্রমা অতীতের প্রাচীন কাল থেকে আধুনিক কালে পর্যন্ত সহসম্মিলিত আছে। এই পথপরিক্রমার মধ্যে, বিভিন্ন মানবজাতি ও তাদের সভ্যতার উত্থানপতন এবং পতন ঘটেছে। এই দীর্ঘ সময় ধারাবাহিকভাবে বিভক্ত হয়েছে কালের পৃষ্ঠভূমি হিসেবে, এবং এই বিভাজনগুলি কাল বিভাজন নামে পরিচিত। এ কাল বিভাজন ইতিহাসের একটি মুখ্য আলোচ্য বিষয় হিসেবে প্রকাশ পায়।”
৪. প্রকৃতি ও পরিবেশ : “পৃথিবীতে মানুষ শুধু একাই বসবাস করে না, বরং মানুষের জন্য সৃষ্টিকর্তা প্রকৃতিগত অনেক কিছু তৈরি করেছে। প্রাকৃতিক সম্পদগুলি ব্যবহার করে মানুষ একটি আদর্শ বাসায় বসবাস করতে পারে, এবং এর ফলে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা মানুষের সংস্কৃতি, বৈচিত্র্য, এবং জীবনধারার গঠনে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। মানুষ এসব প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে যেভাবে বসবাস করে, তা পরিবেশ নামে পরিচিত, এবং এ প্রকৃতি ও পরিবেশ ইতিহাসের আলোচ্য বিষয় হিসেবে প্রকাশ পায়।”
৫. সামাজিক ক্রমবিস্তার : “মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সমাজে মানুষ বসবাস করে নিজেদের প্রয়োজনে এবং সুপ্রাচীন কাল হতেই সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলে। এই সমাজের উৎপত্তি, গঠন, প্রভাব বিস্তার, এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রথা-সংস্কৃতির উদ্ভব ইতিহাস আলোচনা করে। সমাজবদ্ধ জীবনের গতি-ধারা এবং মানবসমাজের উন্নতি-প্রশাসনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইতিহাস মানবজীবনের বৃদ্ধি ও পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করে।”
৬. অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড : “মানুষের জীবনে অর্থ হচ্ছে একটি মৌলিক প্রয়োজন। এ কারণে সুপ্রাচীন কালে মানুষের জীবিকা তথা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং এটি সমাজের উন্নতির প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছিল। ইতিহাস ব্যাপারে আলোচনা করতে হলে, সুপ্রাচীন কাল থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রস্তুতি, বাজার সংবাদ, বাণিজ্য, মুদ্রা ব্যবস্থা, শোকার্থ নির্মূলন, শোষণ ও পরিচালনার প্রকার, কৃষি এবং শক্তির ব্যবহার সহ বিভিন্ন অঙ্গে অর্থনীতির বৃদ্ধির প্রক্রিয়াগুলি উল্লেখযোগ্য হয়েছে।”
৭. ধর্মীয় প্রভাব : “সুপ্রাচীন কালে মানুষ ধর্ম নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করত, এবং ধর্ম তার জীবনে কতটা গুরুত্ব পায়, তা ইতিহাস উপাধীত করে। ধর্মের উৎপত্তি এবং এর ক্রমবিকাশে, সংগঠনে, রীতিনীতি এবং অন্যান্য দিকে ইতিহাস প্রবর্তন হয়েছিল।”-
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, ইতিহাস কেবল অতীতের ঘটনার বিবরণ নয়, বরং এটি মানব সভ্যতার বিকাশ ও অগ্রগতির এক অমূল্য দলিল।