১৯৬৫ সালে পাকিস্তান ও ভারত যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল আলোচনা কর ।
অথবা, ১৯৬৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মির সমস্যার বিবরণ দাও।
অথবা, ১৯৬৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার যুদ্ধের কারণগুলো কী কী?
উত্তর৷ ভূমিকা : ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারতের বিভক্তির পর থেকে কাশ্মির সমস্যাকে কেন্দ্র করে বারবার সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এ সমস্যাকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘের প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে এবং ১৯৬৫ সালে তা চরম পর্যায়ে উপনীত হয়। এমনি পরিস্থিতিতে ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর শুরু হয় পাক-ভারত যুদ্ধ। যুদ্ধ বন্ধের জন্য ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫, জাতিসংঘের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল উত্থান্ট পাকিস্তান ও ভারতের নিকট আবেদন জানায়। নিরাপত্তা৷ পরিষদ উভয় পক্ষকে তাদের সেনাবাহিনীকে স্ব-স্ব সীমানায় অপসারণ করার অনুরোধ জানায়। নিরাপত্তা পরিষদ ৬ সেপ্টেম্বর পুনরায় তাদের যুদ্ধ বিরতির নির্দেশ দেয় এবং পাক-ভারত সীমানায় যুদ্ধ বিরতি ও সৈন্য অপসারণ নির্দেশ কার্যকর করার জন্য সামরিক পর্যবেক্ষক প্রেরণ করে। কিন্তু যুদ্ধ বন্ধ হয় না। অবশেষে ১৭ দিন যুদ্ধ চলার পর সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যস্থতায় ‘তাসখন্দ চুক্তির’ মাধ্যমে এ যুদ্ধের অবসান ঘটে।
পাক-ভারত যুদ্ধের কারণ : মূলত কাশ্মির সমস্যাকে কেন্দ্র করেই ১৯৬৫ সালে দ্বিতীয় বারের মত পাক- ভারত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নিচে কাশ্মির সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :
১৯৪৭ সালের পূর্বাবস্থা : একাদশ শতকে কাশ্মিরে সুলতান মাহমুদের আগমনের পর থেকে ১৩২০ এর দশকে মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সময় পর্যন্ত কাশ্মিরের শাসন ক্ষমতার অন্তত ১৮ বার হাত বদল ঘটে এবং অন্তত ২১টি রাজবংশ কাশ্মির শাসন করে। ঐ সময় কাশ্মিরের শাসক ছিলেন সুলতান রুদ্দিন। ১৩২২ সালে সদরুদ্দিন এর মৃত্যু হলে তাঁর বিধবা পত্নী উদয়ন দেবকে বিয়ে করেন। উদয়ন দেব তখন নিজকে রাজা ঘোষণা করেন। তিনি ১৩৩৮ সালে মৃত্যুবরণ করলে সুলতান শামসুদ্দিন কাশ্মিরের ক্ষমতা দখল করেন। ১৫৮৭ সালে মুঘল সম্রাট আকবর কাশ্মির জয় করলে দীর্ঘ প্রায় দুইশত বছর মুঘলদের অধীনে কাশ্মির শাসিত হয়। এরপর আহমদ শাহ দুররানী নামক একজন কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। ৬৭ বছর আফগান শাসনের পর ১৮১৯ সালে রনজিৎ শিং নামক একজন শিখ কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণ ভার গ্রহণ করেন। ১৮৪৬ সালের ১৬ মার্চ ব্রিটিশরা শিখদের পরাজিত করে কাশ্মির রাজ্যটি ডোগরা রাজা গোলাব সিং এর
কাছে পঁচাত্তর লাখ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় এর অধিপতি ছিলেন গোলাব সিং এর উত্তর পুরুষ সামন্ত রাজা হরি সিং।
১৯৪৭ সালের ঘটনা : ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে পাক-ভারত নামে দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। এ সময় রাজা হরি সিং ভারত বা পাকিস্তান কোন রাষ্ট্রেই যোগদান না করে স্বাধীনভাবে কাশ্মির শাসন করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। কিন্তু কাশ্মিরী মুসলমান, হিন্দু ও শিখরা শেখ আবদুল্লাহর নেতৃত্বে ‘ন্যাশনাল কনফারেন্স এর পতাকাতলে ‘গণতান্ত্রিক কাশ্মির’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু করে। তারা সামন্ত প্রভুদের শাসন মেনে নেবে না। অন্যদিকে, অক্টোবর মাসে ‘আজাদ কাশ্মির’ নামে মুসলিম কাশ্মির সৃষ্টির লক্ষ্যে শ্রীনগর অভিযান শুরু হয়। এমতাবস্থায় জনসমর্থনহীন হরি সিং ভারত সরকারের কাছে সাহায্য ও সহযোগিতা প্রার্থনা করেন। ভারত সরকার হরি সিংকে সাহায্য করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয় এ শর্তে যে, তাঁকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। শেষ পর্যন্ত কোন উপায় না দেখে ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর ভারতের সাথে হরি সিং এক চুক্তি অনুমোদন করে। চুক্তি অনুযায়ী কাশ্মিরের জনগণ যতদিন পর্যন্ত নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের পৃথক সংবিধান রচনা করতে না পারছে, ততদিন ভারতীয় সংবিধানের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থানুযায়ী প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক বিষয় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়া আর
সব বিষয় থাকবে জম্মু ও কাশ্মিরের সরকারের অধীনে। ১৯৪৭ সালের ৩০ অক্টোবর হরি সিং একটি জরুরি প্রশ্নাসন কমিটি গঠন করেন। এর শীর্ষে রাখা হয় শেখ আবদুল্লাহকে। এদিকে উক্ত সহযোগিতা চুক্তির অজুহাতে ভারত সেনাবাহিনী পাঠিয়ে কাশ্মিরের দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এহেন অবস্থায় আজাদ কাশ্মিরের সহায়তায় এগিয়ে আসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ফলে শুরু হয়ে যায় পাকিস্তান-ভারত সংঘর্ষ।
জাতিসংঘের প্রস্তাব : কাশ্মির সংক্রান্ত পাক-ভারত সমস্যার সমাধানের জন্য ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে জাতিসংঘে উত্থাপন করা হয়। এ ব্যাপারে ১৯৪৮ সালের ২১ এপ্রিল তিন দফা প্রস্তাব গৃহীত হয়। যথা : ১. জম্মু ও কাশ্মীরের শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, ২. সেখানে গণভোট অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা এবং শান্তিপূর্ণ ও অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করে রাজ্যের জনগণের মতামত নিয়ে জম্মু-কাশ্মীরের অবস্থান ঠিক করা।
ভারতের আচরণ : ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু জাতিসংঘে তার ভাষণে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, কাশ্মিরে গণভোট দেওয়া হবে; কিন্তু তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গণভোট দেওয়া হয়নি। এদিকে ১৯৪৮ সালের ৫ মার্চ শেখ আবদুল্লাহকে মুখ্যমন্ত্রী করে হরি সিং কাশ্মিরে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেন। শেখ আবদুল্লাহ ছিলেন স্বাধীনচেতা ও অসাম্প্রদায়িক। গণবিরোধী ভূমিকার কারণে জনগণের বিক্ষোভের মুখে বাধ্য হয়ে হরি সিং ১৯৪৯ সালের জুন মাসে তাঁর পুত্র করণ সিংহের নিকট দায়িত্বভার অর্পণ করেন। ১৯৫১ সালের ১৫ অক্টোবর সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে কাশ্মিরে নির্বাচন হয়। নির্বাচনে শেখ আবদুল্লাহর দল বিজয় লাভ করে। শেখ আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন কাশ্মির সরকার নতুন সংবিধান রচনার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে বিরোধ দেখা দেয় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে। নেহেরুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও ১৯৫৩ সালের ৯ আগস্ট শেখ আবদুল্লাহ গ্রেফতার হন। শ্রীনগরে প্রতিষ্ঠিত হলো কংগ্রেস সরকার। সে সময় থেকেই কাশ্মিরে বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্ম হয়।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, পাকিস্তান ভারত যুদ্ধ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ। পূর্ব পাকিস্তান ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত ও নিরাপত্তাহীন যা এ যুদ্ধের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়।