ডিগ্রি প্রথম এবং অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ ২০২৩ এর সকল বিষয়ের রকেট স্পেশাল ফাইনাল সাজেশন প্রস্তুত রয়েছে মূল্য মাত্র ২৫০টাকা প্রতি বিষয় এবং ৭ বিষয়ের নিলে ১৫০০টাকা। সাজেশন পেতে দ্রুত যোগাযোগ ০১৯৭৯৭৮৬০৭৯

 ডিগ্রী সকল বই

হাসান আজিজুল হকের ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ বিষয় ও বিন্যাসে অসামান্য এক শিল্পকুসুম।”— বিশ্লেষণ কর।

অথবা, ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পের শিল্পসার্থকতা বিচার কর।
অথবা, ““আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পটি বিষয়বৈভব ও প্রকরণ শিল্পে অত্যুচ্চ মানের।”- আলোচনা কর।
উত্তর :
বর্তমান সময়ের বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাকার হাসান আজিজুল হক (জ. ১৯৩৯-) ছোটগল্পের ধারায় সংযোজন করেছেন একটি স্বতন্ত্র মাত্রা। প্রধানত, উত্তর বাংলার গ্রামীণ জীবন ও জনপদ তাঁর ছোটগল্পের কেন্দ্রীয় শিল্প-উপাদান। বস্তুবাদী জীবনদৃষ্টির আলোয় তিনি উন্মোচন করেছেন সমাজজীবনের বহুমাত্রিক অবক্ষয়, শোষিত দলিত মানুষের হাহাকার, নিম্নবর্গের দ্রোহ ও সংক্ষোভ কখনো বা তাদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের কাহিনি। বস্তুত, হাসান আজিজুল হক হচ্ছেন সেই ব্যতিক্রমী গল্পকার, যাঁর বেশ কিছু গল্প সমগ্র বাংলা ছোটগল্পের ধারায় নির্দ্বিধায় প্রথম পংক্তিতে আসন পাবার যোগ্য। উত্তর-বাংলার গ্রামীণ জনপদের ভাঙন, মূল্যবোধের ধস, সামাজিক শোষণ, কখনো প্রতিবাদ, বাঁচার সংগ্রাম- এসব কথা নিয়ে হাসানের গল্পজগৎ। সামাজিক অবক্ষয় এবং মূল্যবোধের বিপর্যয় ধরতে তিনি ব্যক্তিমানুষের যৌনজীবনের পদস্খলনকেই তাঁর গল্পের
শিল্প-উপাদান হিসেবে নির্বাচন করেছেন প্রাক্-সত্তর গল্পপর্বে। কিন্তু ক্রমে তিনি অবগাহন করছেন রাঢ় বাংলার বৃহত্তর জনজীবনসাগরে, এবং সেখান থেকে এনেছেন বেঁচে থাকার সঞ্জীবনী সুধা, দ্রোহ-বিদ্রোহ-প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সূর্যদীপ্ত বাণী। ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ হাসান আজিজুল হকের একটি অসামান্য নির্মাণ। অভিন্ন নামের গল্প-সংকলন ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ (১৯৬৭) গ্রন্থে এটি গ্রথিত। উদ্বাস্তু ছন্নছাড়া এক শরণার্থী বৃদ্ধের জীবনযাপনের মর্মদাহী এক বৃত্তান্ত ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’। বস্তুতপক্ষে, বক্ষ্যমাণ গল্পে তেমন কোনো কাহিনি নেই। গ্রামের তিন বখে-যাওয়া যুবক দেশছাড়া এক বুড়োর কন্যাকে ভোগের আকাঙ্ক্ষায় বেরিয়েছে, পৌঁছেছে তারা বুড়োর বাড়িতে এবং অর্থের বিনিময়ে স্ত্রীকে শাসন করে বুড়ো দুই যুবককে পাঠিয়ে দিলো আত্মজার ঘরে-এই-ই হচ্ছে বক্ষ্যমাণ প্রতিবেদনের মৌল ঘটনাংশ। ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্পের ঘটনাস্রোত এগিয়ে চলেছে চরিত্রের মনোলোকে-কখনো এনাম-ফেকু-সুহাস, কখনো-বা কেশো বুড়োর মনোলোকের ক্রমভঙ্গুর ভাবনায় এগিয়ে চলেছে শিল্পিতা পেয়েছে আলোচ্য গল্পের ঘটনাংশ। ইনাম-ফেব্রু-সুহাস-তিনজনই বখে যাওয়া যুবক, অর্থের বিনিময়ে কেশো বুড়োর আত্মজা রুকু-কে ভোগ করতে তারা রাতের আঁধারে বেরিয়েছে, উদ্দেশ্য তাদের কেশো বুড়োর বাড়ি। কিন্তু যাত্রাপথে সে-কথা কেউ-ই বলছে না, বলছেন না লেখকও। বরং উল্টোভাবে দেখি নানা ভাবনায়, কখনো এককভাবে, কখনো সম্মিলিত স্রোতে ভগ্নক্রম বিন্যাসে সময় এগিয়ে চলে, এগিয়ে চলে তিন যুবকের শীতরাত্রির অভিসার। রুকুকে ভোগ করার জন্য তিন যুবকের যাত্রা তাদের ভাবনায় কখনোই ধরা দেয়নি-নাকি কৌশলে তাদের মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা দূর করতে চেয়েছেন উগ্নক্রম কথা-বুননের ছলে? ইনাম-ফেতু-গুহাস কথা বলছে পরস্পরের সঙ্গে-কিন্তু কেউ-ই শুনছে না অন্যের কথা, কারণটা তাদের অন্তর্গত উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠা, নাকি সুখ-কল্পনা? ভগ্নক্রম বিন্যাসে, চূর্ণ-চূর্ণ ছবির মাধ্যমে লেখক তুলে ধরেছেন ইনাম-ফেকু সুহাসের অন্তর্গত ভাবনায়। কেশোঁ-বুড়ো উদ্ধান্ত মানুষ, দেশ ছাড়া অসহায় এক পিতা। চরিত্রসমূহের ভাষা থেকে বুঝা যায়, এদের বাস উত্তরবঙ্গে। পক্ষান্ত রে কেশো-বুড়ো শুকনো-দেশ (পশ্চিমবাংলা কি?) থেকে এসেছে সে-অঞ্চলে। বুঝা যায় দেশ-বিভাগের পটভূমিতে লেখা এই গল্প।
দেশবিভাগ মানুষকে, বাংলার জনসাধারণকে যে-ভাবে বিপন্ন উন্মুলিত লাঞ্ছিত করেছে, তারই যেন প্রতীকী রূপ কেশো-বুড়ো। দেশ-
ত্যাগের ফলে শূন্য হয়ে গেছে তার ভিতর বাহির-আত্মদাকেও তাই তার কাছে মনে হয়েছে বিষবৃক্ষের বীজ। দেশত্যাগের এই মর্মদাহী যন্ত্রণাকথা উঠে এসেছে কেশো-বুড়োর অন্তর্গত ভাবনায়- কে আর আসবে এখানে মরতে। জেগেই তো ছিলাম। ঘুম হয় না মোটেই-ইচ্ছে করলেই কি আর ঘুমানো যায় তার একটা বয়েস আছে-অজস্র কথা বলতে থাকে সে-মনে হয় না, বাজে কথা বকবক করেই যায়। এসো বড্ড ঠাণ্ডা হে, ভেতরে এসো। কিন্তু ভেতরে কি ঠাণ্ডা নেই? একই রকম। দেশ ছেড়েছে যে তার ভেতর বাইরে নেই। সব এক হয়ে গেছে। তোমরা না থাকলে না খেয়ে মরতে হোত এই জংগুলে জায়গায়-বুড়ো বলছে, বাড়ির বাগান থেকে অন্ন জোটানো আবার আমাদের কম-হ্যা:। ও তোমরা জানো। আমরা শুকনো দেশের লোক বুইলে না-সব সেখানে অন্যরকম, ভাবধারাই আলাদা আমাদের। এখানে না খেয়ে মারা যেতাম তোমরা না থাকলে বাবারা।” সংসার নির্বাহের জন্য কেশো-বুড়োৃ আত্মজাকে তুলে দিয়েছে ভোগবিলাসী যুবকদের কাছে। রুকু কোনো প্রতিবাদ করেছে কিনা, তার স্বাক্ষর নেই গল্পে। কিন্তু রুকুর মা যে প্রতিবাদ করেছে, মেনে নেয়নি এই অনাচার, তা বোঝা যায় কেশো-বুড়োর এই ভর্ৎসনা থেকে- ‘চুপ, চুপ, মাগী চুপ কর, কুত্তী-এবং সমস্ত চুপ হয়ে যায় সঙ্গেই নেই, বেঁচে থাকার জন্য আত্মজাকে এইভাবে ব্যবহার করতে গিয়ে কেঁপে উঠতো কেশো-বুড়োর মর্মলোক। তাই তিন যুবক ঘরে প্রবেশের সময় করবী গাছের বর্ণনা দেন লেখক এই প্রতীকী ভাষ্যে- ‘. সবাই ভিতরে আসতে করবী গাছটার একটা যাল ঝটকানি দেয়। ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ একটি প্রতীকী গল্প। করবী গাছটাই এখানে আত্মজার প্রতীক। করবী গাছে যে বিচি হয়, তা বিষের আধার, রুকুও তো পিতা কেশো-বুড়োর কাছে চিরায়ত এক বিষকাণ্ড। তাই ঘুরে ঘুরে এ গল্পে আসে করবী গাছের কথা-গল্পের নামকরণ থেকে পরিণতি পর্যন্ত। করবী গাছটাই যে হয়ে উঠে যন্ত্রণার উৎস, ওটাই যে রুকুর মর্মদাহী অস্তিত্ব কেশো- বুড়োর হার্দিক বয়ানে তা উঠে এসেছে ভয়ানকভাবে- ‘…এখানে যখন এলাম- আমি প্রথমে একটা করবী গাছ লাগাই…ফুলের জন্যে নয়, বুড়ো বলল, বিচির জন্যে, বুঝেছ করবী ফুলের বিচির জন্যে। চমৎকার বিষ হয় করবী ফুলের বিচিতে। বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে দেশ-বিভাগের ঝাপটায় মানুষের জীবনে বিপন্নতা দেখা দিয়েছিল নানাভাবে দেখা দিয়েছিল মূল্যবোধের ভয়াবহ ধস। ইনাম-ফেকু সুহাসের আচরণে, ভাষা ও ভাষ্যে এই ধসের ছবিই প্রকাশিত। অর্থের বিনিময়ে পিতা-মাতার সামনে কোনো নারীর ঘরে যেতে তাদের বাধে না, যখন-তখন তারা অশ্লীল কথা বলে, তাদের মুখ দিয়ে বের হয় এসব টুকরো রুচিহীনতা- ক. সকালে সূর্য উঠতি মধুমতী ঝকঝক করিতেছে, জ্যাঠামশাই ধপ করে কাদায় পড়িলো লঞ্চ থেকে নামতি গিয়ে আর মামীর বোনেরা যা সোন্দার সে কথা আর কলাম না। তোর মামার বাড়িটা কোয়ানে, শালীরা বেড়াতি আসলি কস আমাকে ফেকু কথা না বললেই নয়, তাই বলে। সেটি হচ্ছে না, বুজিচো চোখ বন্ধ করে মনের আরামে বলল সুহাস। ও, তাই তুমি মাসে পাঁচবার করে ছোটমামার শ্বশুরবাড়ি বেড়াতি যাচ্ছো, বুজিচি, ও খেনে তো পয়সা কড়ি লাগে না-আরামেই আছো দেখা যায়- খ. সুহাস থুথু ফেলে বলে, শালা খ্যাল গাতিছে-বলেই চাবি বন্ধ করে এবং তুমি যে আমার জীবনে এসেছ ধরে দেয়। গ. করবটা কি কতি পারিস? লেহাপড়া শিখলি না হয় । লেহাপড়ার মুহি পেচ্ছাপ-ইনাম বলল। আবার অসহ্য লাগল ওর। তাহলি-ফেকু ভেবে চিন্তে বলল, উঁচো জায়গায় দাঁড়ায়ে সবির ওপর পেচ্ছাপ।
-উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিগুচ্ছ থেকে সুহাস, ফেকু ও ইনামের মনোলোকের রুচিহীনতা সহজেই অনুধাবন করা যায়। অপরদিকে, একই
সঙ্গে এখানে আছে পুরুষতান্ত্রিকতার ইঙ্গিত। তিন যুবক কথায় কথায় ‘শালী’ শব্দ উচ্চারণ করে, অর্থাৎ অনবরত বিয়ে করতে চায়।
অন্যদিকে কেশো-বুড়ো, ক্ষমতাহীন কপর্দকশূন্য কেশো বুড়ো কেবল পুরুষ বলেই স্ত্রীকে বলতে পারে ‘মাগী চুপ কর, কুত্তী’ কিংবা আত্মজার উপর বিস্তার করতে পারে পুরুষতান্ত্রিক দাপটতা। সামাজিক ধস আর অবক্ষয়, দেশবিভাগজনিত মানবিক বিপন্নতার পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিকতার কাছে নারীর এই লাঞ্ছনাও বক্ষ্যমাণ গল্পটিকে করে তুলেছে কালোত্তীর্ণ। কেশো-বুড়ো নিম্নবর্গের মানুষ আত্মজাকে গ্রামীণ যুবকদের কাছে বিক্রি করে তাকে নির্বাহ করতে হয় সংসার। সুহাস ফেতু ইনাম-এরাও নিম্নবর্গ। সুহাসকে নারী-ভোগের জন্য বড় ভাইয়ের পকেট মারতে হয়, ইনাম ভিড়ের মধ্যে মানুষের পকেট মারতে গিয়ে ধরা পড়ে, ফেকুকে দু’টাকা জোগাড় করতে গলদঘর্ম হতে হয়। টাকা নেই বলে ইনাম যেতে পারে না রুকুর ঘরে-এসবই বঙ্গ দেয় ওই চরিত্রগুলোর অবস্থান নিম্নবর্গে। লক্ষণীয়, এসব ক্ষমতাহীন পুরুষ অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছে নারীর কাছে। নিম্নবর্গের সমাজ বাস্তবতায় নারী যে আরো নিম্ন-অবস্থানে, তারা যে ‘তলের তল’ †সকথা রুকু কিংবা তার মায়ের অবস্থা ও অবস্থান অনুধাবন করা যায়। বয়ান-কৌশলে ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ একটি অনুপম সৃষ্টি। গোটা গল্পটাই রচিত হয়েছে, পূর্বেই বলা হয়েছে, ভগ্নক্রম গঠনরীতিতে। চূর্ণ চূর্ণ ভাবনা একত্র কর এখানে নির্মিত হয়েছে এক কালিক সংকটের ছবি। কেশো-বুড়োই কি সেই বিপন্ন ছন্নছাড়া কালের প্রতিনিধি? গল্পের অভিমে যে কান্নার ছবি আছে, কেশো বুড়োর কান্নার ছবি, তাতো দ্বিখণ্ডিত দেশের কান্নার ছবি, আর কুকুর ধর্ষিত হওয়া কি দেশ-মৃত্তিকাকে খণ্ড খণ্ড করার রূপক ছবি নয়। গল্পের অস্তিমে কেশো-বুড়োর অন্ত:সংলাপে, তার বিক্ষিপ্ত মনোকথনে, তার অসহনীয় যন্ত্রণাভাষ্যে, তার বেদনার্ত তার আত্মজার অপমানে দেশ কি কথা বলে উঠে না। কেঁদে কি উঠে না দেশ-মাতা? তা না হলে অস্তিমে কেন লেকক নির্মাণ করবেন অসামান্য এই ভাষ্য- বুড়োটা গল্প করছে, ভীষণ শীত করছে ওর গল্প করতে, চাদরটা আগাগোড়া জড়িয়েও লাভ নেই। শীত তবু মানে, শ্লেষ্মা কিছুতেই কথা বলতে দেবে না তাকে। আমি যখন এখানে এলাম, সে গল্প করেই যাচ্ছে, আমি যখন এখানে এলাম, হাঁপাতে হাঁপাড়ে, কাঁপতে কাঁপতে বলছে, বুঝলে যখন এখানে এলাম। তার এখানে আসার কথা আর কিছুতেই ফুরোচ্ছে না-সারারাত ধরে সে বলছে, এখানে যখন এলাম আমি প্রথমে একটা করবী গাছ লাগাই-তখন হু হু করে কে কেঁদে উঠল, চুড়ির শব্দ এলো, এলোমেলো শাড়ীর শব্দ আর অনুভবে নিটোল সোনারঙের দেহ সুহাস হাসছে হি হি হি-আমি একটা করবী লাগাই বুঝলে-বলে থামলো বড়ো, কান্না শুনল, হাসি শুনল-ফুলের জন্যে নয়, বুড়ো বললো, বিচির জন্যে, বুঝেছ করবী ফুলের বিচির জন্যে। চমৎকার বিষ হয় করবী ফুলের বিচিতে। আবার হু হু ফোঁপানি এলো আর এক কথা বলে গল্প শেষ না করতেই পানিতে ডুবে যেতে, ভেসে যেতে থাকল বুড়োর মুখ-প্রথমে একটা করবী গাছ লাগাই বুঝেছ, আর ইনাম মনে মনে ভেতো তেতো-এ্যাহন তুমি কাঁদতিছ? এ্যাহন তুমি কাঁদতিছ? ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’-এর বুনন-কৌশলে লক্ষ করা যাবে, লেখক সুনিপুণ বিন্যাসে এক বাক্যের আধারে একাধিক চরিত্রের মনোকথন ঢুকিয়ে দিয়েছেন, ব্যাকরণহীন বিন্যাসে গল্প-কাহিনি নিয়ে গেছেন সামনের দিকে। চলচ্চিত্রের কার্ট-কাট রীতিতে হয়েছে বক্ষ্যমাণ গল্প। গল্পটির প্রথম থেকে শেষ অবধি ক্রিয়াশীল থেকেছে অদ্ভুত এক কৌতূহল। কৌতূহলকে কখনো মিইয়ে হতে দেননি লেখক। ঘটনাংশের একমুখী গতি গল্পটির ব্যঞ্জনার্থ নির্মাণে পালন করেছে প্রত্যাশিত ছোটগাল্পিক ভূমিকা। উপমা-সমাসোক্তি উৎপ্রেক্ষা অলঙ্কার সৃজনে লেখক চরিত্রের অভ্যন্তর মনস্তত্ত্বকে প্রাধান্য দিয়েছেন, ফলে অলঙ্কারগুলো হতে পেরেছে প্রাণবত্ত। লক্ষণীয় নিচের অলঙ্কারপুঞ্জ-
ক. সে বলছে এট্টু এট্টু সর হইছে এমন ডাবের মতো লাগে মেয়েডারে। খ. গেট পেরিয়ে খানিকটা ফাঁকা জমি চিৎ হয়ে শুয়ে।
গ. মুহূর্তে সোনালী হাত সামনের আবহাওয়ায় ভেসে উঠে নীল পানিতে শাদা মাছের পেটির মতো। ঘ. বোশেখ মাসের তাপে মাটিতে যেন ফাটলের আঁকিবুকি এমনি ওর মুখ। বক্ষ্যমাণ গল্পটিকে মুরগির পৌনঃপুনিক ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বস্তুত, মুরগির কঁকঁ আর্তনাদ, পৌনঃপুনিক ডাক বক্ষ্যমাণ গল্পে প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে। সুহাস-ফেকু- ইনাম যখন কেশো-বুড়োর ঘরে ঢুকলো, তখন মুরগীর কঁকঁ ধ্বনি বস্তুত, রুকুর আসন্ন কান্নার রূপকছবি- ‘ভিতরে কালো রঙের চৌকিটা পড়ে আছে। ঘুমের মধ্যে মুরগীগুলো কঁকঁ করে উঠলো। কথাকোবিদের নিপুণ পর্যবেক্ষণেরও সাক্ষাৎ পাওয়া যায় এখানে। শিয়াল যে ডাক ছাড়ার সময় পা তুলে দেয়, বর্ণনায় আছে সে পর্যবেক্ষণের ছাপ- ‘এক সময় কানুর মায়ের কুঁড়ে ঘরের পৈঠায় সামনের পা তুলে দিয়ে শিয়াল ডেকে ওঠে। গল্পের অন্তিমে রুকুর
ঘরে ফেকু-সুহাসের আচরণ এলিয়ে পড়তে পারতো, স্থূল বর্ণনায় ওই এলাকা হতে পারতো পথহারা, কিন্তু হাসান আজিজুল হক ভাষার আবরণে কী নিপুণতায় গোটা ঘটনাটি মাত্র একটি খণ্ডবাক্যে উপস্থাপন করেছেন- আমি প্রথমে একটা করবী গাছ লাগাই-তখন হু হু করে কে কেঁদে উঠল, চুড়ির শব্দ এলো, এলোমেলো শাড়ীর শব্দ আর অনুভবে নিটোল সোনারঙের দেহ. হাসান আজিজুল হকের ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ বিষয় ও বিন্যাসে অসামান্য এক শিল্পকুসুম। মানুষের বাঁচার সংগ্রাম কত মর্মদাহী হতে পারে, কেশো বুড়োর আধারে সে-কথাই ব্যক্ত হয়েছে বক্ষ্যমাণ গল্পে। প্রতিবেদনের অন্তঃস্রোতে প্রবহমাণ সামাজিক ভাবনা গল্পটিকে করে তুলেছে সমকালস্পর্শী, একই সঙ্গে কালোত্তীর্ণ।



পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!