অথবা, সারসত্তা কী? আল-কিন্দির মতে বস্তুর সারসত্তা কী? আলোচনা কর।
অথবা, সারসত্তা কাকে বলে? সারসত্তা সম্পর্কে আল-কিন্দির মতবাদ কী? বর্ণনা কর।
অথবা, আল-কিন্দির মতে সারসত্তা কী? বস্তুর সারসত্তা সম্পর্কে আল-কিন্দির মতবাদ আলোচনা কর।
অথবা, সারসত্তা সম্পর্কে আল-কিন্দির মতবাদ বিশ্লেষণ কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
মুসলিম দর্শনে মুতাজিলা সম্প্রদায়ের চিন্তাবিদগণ গ্রিকদর্শনের বুদ্ধিবাদকে ব্যবহার করেছিলেন ধর্মতাত্ত্বিক সমস্যাবলি সমাধানে। অন্যদিকে, অন্য একটি দল একই প্রয়োগ পদ্ধতি আরও নিষ্ঠার সাথে ব্যবহার করেছিলেন। শুধু ধর্মতাত্ত্বিক নয়, দর্শনের মৌলিক সমস্যার সমাধানে। মুসলিম দর্শনের ইতিহাসে এ দলটি ‘ফালাসিফা’ নামে পরিচিত । ইসলাম ধর্মের আওতায় থেকে গ্রিক দর্শনের বুদ্ধিবাদী পদ্ধতিকে তারা দক্ষতার সাথে প্রয়োগ করেছেন। এ চিন্তাধারার অগ্রনায়ক ছিলেন আল-কিন্দি। দর্শন ও বিজ্ঞান অধ্যায়নে আল-কিন্দি ছিলেন আরবীয় মুসলমানদের মধ্যে প্রথম। আর এ দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে আরব দার্শনিক বলা হয়ে থাকে।
সারসত্তা এর সংজ্ঞা : সারসত্তা সম্পর্কিত আলোচনা মৌলিক সমস্যা সম্পর্কিত আলোচনা। আর তাই দর্শনে এটি বিশেষ গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়েছে। সারসত্তার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Essence। সারসত্তার প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণের প্রচেষ্টা দর্শনের আবহমানকালের ঐতিহ্য। আমরা স্বভাবতই প্রত্যক্ষভাবে যে অভিজ্ঞতার সম্পর্কে জড়িত হই, তাকে অপর কিছুর প্রকাশ মনে করে, গভীর কোন অস্তিত্ব এবং সাধারণভাবে মানবাত্মার প্রকাশের পার্থক্যরোধ বলে কল্পনা
করি, আর তা মানুষের মধ্যে দৃশ্যমান বস্তুর জগতের পরিবর্তনশীলতা থেকেই প্রথমে উদ্ভূত হয়। দৃশ্যমান জগতের সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী। পরিবর্তনশীল জগতে সবকিছুর স্থিরতা মুহূর্তকালের। এগুলোর মধ্যে যেগুলো যতবেশি স্থায়ী সেগুলো তত বেশি মৌলিক এবং যতবেশি ক্ষণস্থায়ী সেগুলো মৌলিক বিষয় বা বস্তুর প্রকাশমাত্র। অধিকতর স্থায়ী বা স্থিরকে অধিক মূল্যদান মানুষের জীবনের প্রয়োজনের দিক থেকে স্বাভাবিক। ক্ষণস্থায়ী থেকে দীর্ঘস্থায়ী অস্তিত্বের কল্পনার সাথে মানুষ
বস্তুর পরিবর্তনের হ্রাস বৃদ্ধিকেও যুক্ত করেছে। এর ফলে বলা যায় যে, এ চিরস্থায়ী বস্তুর চরম মূল্য আছে। বস্তুত এ চির স্থায়িত্বই বস্তুর সারসত্তা বা Essence.
বস্তুর সারসত্তা সম্পর্কে আল-কিন্দি : আল-কিন্দি মুসলিম দর্শনে অনেকগুলো অধিবিদ্যক সমস্যা উপস্থাপন করেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি আরবীয় চিন্তাধারাকে এ খাতে প্রবাহিত করেন এবং প্রত্যাদিষ্ট মতাবলির ব্যাপারে তাঁর অনুগামীদের উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি তাঁর On the Five Essence প্রবন্ধে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা
করেছেন। এখানে তিনি পাঁচটি সারসত্তার কথা বলেছেন, সেগুলো হলো :
১.জড়,
২.আকার,
৩. গতি,

  1. কাল ওদেশ।
    ১. জড় : আল-কিন্দি জড়কে সংজ্ঞায়িত করেছেন এমন এক বস্তু হিসেবে, যা অন্যান্য সারধর্মকে গ্রহণ করলেও তা নিজে অন্য কোন সারধর্মের গুণ হিসেবে গৃহীত হয় না। এজন্য অন্যান্য সারধর্মগুলো অস্তিত্বশীল থাকে ততক্ষণ, যতক্ষণ জড় নিজে অস্তিত্বশীল থাকে। যেমন- একটি চেয়ারে যতক্ষণ পর্যন্ত এর জড়ত্ব বিদ্যমান থাকে ততক্ষণ এর আয়তন, আকার, ওজন প্রভৃতি গুণ বিদ্যমান থাকে। গুণ জড়ের অপরিহার্য উপাদান। গুণ ছাড়া জড়ের অস্তিত্বকে কল্পনা করা যায়
    না। অন্যকথায়, জড় থাকলে এর গুণ থাকবে। মোটকথা, জড় গুণের আধার। তাই জড় অন্যান্য সারধর্মকে গ্রহণ করে, কিন্তু নিজে অন্য কোন সারধর্মের গুণ হিসেবে গৃহীত হয় না। এজন্য জড় যতক্ষণ অস্তিত্বশীল ততক্ষণ অন্যান্য সারধর্মগুলো অস্তিত্বশীল থাকে।
    ২. আকার : আল-কিন্দি আকার বলতে বিশেষভাবে একে পৃথকীকরণ করেছেন। তিনি আকারকে দু’ভাগে ভাগ করেন। প্রথমত, আকার হলো জড়ের গুণ, যা জড়ের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে বর্তমান। দ্বিতীয়টি, গঠিত সেসব গুণের সমবায়ে যাদের সাহায্যে জড়কে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, এগুলো এরিস্টটলের দশটি ক্যাটাগরি। যথা : দ্রব্য
    (Substance), পরিমাণ (Quantity), গুণ (Quality), সম্বন্ধ (Relation), দেশ (Space), কাল (Time), অবস্থান (Position), অবস্থা (Condition), ক্রিয়া (Action) এবং নিষ্ক্রিয়তা (Passion)। এ দ্বিতীয় প্রকারের আকার জড়কে প্রকৃত অস্তিত্ব দিয়ে থাকে। এগুলো ছাড়াও জড় বাস্তব, কিন্তু অমূর্ত। এটি মূর্ত হয় তখনই যখন তা দ্বিতীয় আকারটি গ্রহণ
    করে।
    গতি : গতি ছয় প্রকারের। দ্রব্যর মধ্যে দু’প্রকার গতি আছে। সেটি হলো সৃষ্টি ও ধ্বংস। পরিমাণের মধ্যে দুই প্রকারের গতি আছে। সেগুলো হলো হ্রাস ও বৃদ্ধি। আবার গুণের মধ্যে একটি পরিবর্তন এবং অবস্থানের মধ্যে একটি পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়ে থাকে।
    ৪. কাল : আল-কিন্দির মতে, কাল ও গতি সমধর্মী, তবে পার্থক্য হলো গতির মধ্যে বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয় অর্থাৎ, এটি বিভিন্ন দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু কাল বিভিন্ন দিকে ধাবিত হয় না, বরং একদিকে ধাবিত হয়, পূর্বাপর সম্পর্কের মাধ্যমে কালকে জানা যায়। অর্থাৎ, খণ্ডখণ্ড কালের সমন্বয়ে আমরা পূর্ণাঙ্গ কালকে জানতে পারি। শুধু তাই নয়, নিরবিচ্ছিন্ন সংখ্যার অনুক্রমের মাধ্যমেই একে জানা যায়।
    ৫. দেশ : আল-কিন্দি দেশ সম্পর্কে গুরুত্বের সাথে আলোচনা করেছেন। দেশ বলতে তিনি দেহের বিভাগের অংশকে নির্দেশ করে, যা দেহকে বেষ্টন করে রাখে। কিন্তু দেহের স্থানান্তর ঘটলেও দেশের অবস্থিতি বিদ্যমান থাকে। যেমন— পানি ও বায়ু পূরণ করে ফেলে। অর্থাৎ, আমরা শূন্য দেশের কথা বা Empty space কে কল্পনা করতে পারি, কিন্তু
    দেশকে ছাড়া বস্তুকে কল্পনা করতে পারি না।
    মন্তব্য : আল-কিন্দি সারসত্তা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে পাঁচ প্রকারের সত্তার কথা বলেছেন। তার মতে, সত্তাসমূহ হলো জড়, আকার, গতি, কাল ও দেশ। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো যে, আল-কিন্দি দেশ, কাল ও গতিকে একযোগে দেখেছেন। তার মতে, দেশ, কাল ও গতি সবসময় একই সাথে থাকে। এ ধারণার সাথে আমরা আধুনিক
    পদার্থবিদ, আইনস্টাইনের দেশ, কাল সম্বন্ধীয় মতের সাথে সাদৃশ্য দেখতে পাই [দর্শন ও প্রগতি, ১৬শ বর্ষ ১ম ও ২য় সংখ্যা, জুন-ডিসেম্বর, ১৯৯৯ পৃ-২১০]
    উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, আল-কিন্দি সারসত্তার Essence সম্পর্কিত আলোচনার মাধ্যমে মুসলিম অধিবিদ্যক চিন্তাধারার বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি পাঁচ প্রকার সারসত্তার কথা বলেছেন। তিনি গ্রিক দর্শন দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও তার সারসত্তার ধারণা গ্রিক দর্শনের হুবহু অনুকরণ বলা চলে না।
https://topsuggestionbd.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a5%e0%a6%ae-%e0%a6%85%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%86%e0%a6%b2-%e0%a6%95%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a6%bf/
admin

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!