অথবা, ব্রহ্মসূত্রের তৃতীয় সূত্র সংক্ষেপে ব্যাখ্যা কর।
অথবা, ব্রহ্মসূত্রের যে কোন একটি সূত্র সংক্ষেপে আলোচনা কর।
অথবা, ব্রহ্মসূত্র “শাস্ত্র যোনিত্বাৎ সম্পর্কে লেখ।
অথবা, “শাস্ত্ৰ যোনিত্বাৎ” বলতে কী বুঝ?
উত্তর৷ ভূমিকা :
ভারতীয় দর্শনে আস্তিক সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে বেদান্ত দর্শন অত্যন্ত প্রাচীন। মহর্ষি বাদরায়ন বেদান্ত দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা। ব্রহ্মসূত্র এবং এটির ভাষ্যসমূহে ভারতীয় প্রায় সমস্ত সম্প্রদায়ের দার্শনিক মতামত উল্লেখ করা হয়। ব্রহ্মসূত্রে সমন্বয়, অবিরোধ, সাধন ও ফল নামক মোট চারটি অধ্যায়ে সর্বমোট ৫৫৫টি সূত্র রয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে ব্রহ্ম সম্পর্কে বিভিন্ন বেদবাক্যের তাৎপর্যের সমন্বয় করা হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে বিরোধী মতের আলোচনা ও নিরাকরণ করা হয়েছে। তৃতীয় অধ্যায়ে কোন উপায়ে ব্রহ্মবিদ্যা লাভ করা যায় তার আলোচনা রয়েছে। চতুর্থ অধ্যায়ে ব্রহ্মবিদ্যার
ফলাফল আলোচিত হয়েছে। ব্রহ্মসূত্রের প্রতিটি অধ্যায় আবার চারটি পদে বা পরিচ্ছেদে বিভক্ত। প্রত্যেকটি পদে আবার কতকগুলো অধিকরণের সমষ্টি। প্রত্যেকটি অধিকরণ আবার কতকগুলো সূত্র নিয়ে গঠিত।
তৃতীয় সূত্র : শাস্ত্ৰ যোনিত্বাৎ: শাস্ত্র (শ্রুতি) + যোনি (কারণ) + ত্বাৎ (উৎপত্তি স্থান)। পূর্বসূত্রে ব্রহ্মকে জগতের কারণ বলায় তাঁকে কেবল সর্বশক্তিমান বলেই ব্যাখ্যা করা হয় নি, সর্বজ্ঞও বলা হয়েছে। আবার এও বলা হয়েছে যে, শ্রুতি ভিন্ন অন্য কোন প্রমাণ দ্বারা তাঁকে জানা যায় না। এতে বাক্যার্থ ব্যঙ্গ’ বলে গণ্য হতে পারে। পূর্ব সূত্রে ব্রহ্ম যখন সর্বজগতের কারণ, তখন তিনি সর্বজ্ঞ এরূপ অর্থের উপক্ষেপ হয়েছে মনে হতে পারে বলেই তৃতীয় সূত্রের অবতারণা। এ সূত্রে বলা হয়েছে, শাস্ত্রের উৎপত্তির কারণেই ব্রহ্ম সর্বজ্ঞ। বৃহদারণ্যকে উপনিষদেও বলা হয়েছে, যা থেকে বেদাদি, ইতিহাস, পুরাণ, বিদ্যা, শ্লোক, সূত্র, ব্যাখ্যান, অনুব্যাখ্যান এবং উপনিষদসমূহ নির্গত হয়েছে, তিনি সর্বজ্ঞ। আর এ সর্বজ্ঞই হচ্ছেন ব্রহ্ম। মনু মহারাজও বলেছেন, নানা বিদ্যার আকর ও আশ্রয় যে শাস্ত্র, তার উৎপত্তিস্থল হচ্ছেন ব্রহ্ম। অতএব ব্রহ্ম যে সর্বজ্ঞ তা প্রমাণিত হলো। উল্লেখ্য যে, শাস্ত্র অর্থে এখানে শ্রুতিকেই বুঝানো হয়েছে। যা কেউ জানে না, অন্য কোন উপায়ে যা জানা যায় না, শাস্ত্রই সেখানে আশ্রয় । পূর্বসূত্রে ব্রহ্মের সর্বজ্ঞত্ব ব্রহ্মানুসন্ধানীদের পরোক্ষানুভূতি। সেখানে শাস্ত্রের প্রতীক্ষা নেই। কিন্তু সর্বজ্ঞত্ব সম্পর্কে ব্রহ্মানুসন্ধানীদের পরোক্ষানুভূতিই যথেষ্ট নয়, প্রত্যক্ষানুভূতিরও প্রয়োজন। এ সূত্রে শাস্ত্রের প্রতিক্ষা দ্বারা ব্রহ্মের সর্বজ্ঞত্ত্ব সম্পর্কে ব্রহ্মানুসন্ধানীদের প্রত্যক্ষানুভূতিকে জাগ্রত করা হয়েছে। সুতরাং ‘শাস্ত্র যোনিত্বাৎ’ সূত্রটির দুটি অর্থ আমরা করতে পারি। ১. শাস্ত্রের মাধ্যমে ব্রহ্মকে জানা যায় এবং ২. ব্রহ্মই শাস্ত্রের মুল কারণ।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ব্রহ্মের প্রথম লক্ষণ হলো তিনি সৃষ্টি, স্থিতি এবং প্রলয়ের উপাদান ও নিমিত্ত- কারণ। দ্বিতীয় লক্ষণ ব্রহ্ম থেকেই শাস্ত্রের উৎপত্তি বলে ব্রহ্ম সর্বজ্ঞ। সৃষ্টাদি ও শাস্ত্রাদির আকারগত ও অর্থগত পার্থক্যের মূলে রয়েছে ব্রহ্মের একাংশের অভিব্যক্তি। শঙ্করাচার্য সৃষ্টিকে মায়া এবং শাস্ত্রকে অবিদ্যা আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু জগৎ ও শাস্ত্র অপূর্ণ হলেও ব্রহ্মেই এরা অন্বিত হচ্ছে। এজন্যই দ্বিতীয় ও তৃতীয় সূত্রের পর চতুর্থ সূত্রের উপস্থাপন অনিবার্য হয়ে পড়েছে। তাই এ কারণেই বাদরায়ন প্রথম সূত্রের পর দ্বিতীয় সূত্র, দ্বিতীয়ের পর তৃতীয় সূত্র এবং তৃতীয়ের পর চতুর্থ সূত্রকে পর্যায়ক্রমে উপস্থাপিত করেন।

https://topsuggestionbd.com/%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a6%b6-%e0%a6%85%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a4/
admin

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!