অথবা, যুক্তফ্রন্ট গঠনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা কর।
উত্তর ভূমিকা :
পূর্ব বাংলার মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্ট গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাঙালি জাতি, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি এবং বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগ নেতৃত্বের
কার্যকলাপ ও পাকিস্তানি শাসকদের ছয় বছরের শোষণের বিরুদ্ধে এ নির্বাচন ছিল ব্যালট বিপ্লব। কেননা এ নির্বাচন স্ব-স্ব
দলগুলোর জনমত যাচাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
যুক্তফ্রন্ট গঠনের পটভূমি বা প্রেক্ষাপট : নিচে যুক্তফ্রন্ট গঠনের পটভূমি আলোচনা করা হলো :
১. লাহোর প্রস্তাবের তারতম্য : মূল লাহোর প্রস্তাবে যে আঞ্চলিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতিশ্রুতি ছিল তা ১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের দলীয় সদস্যদের সম্মেলনে তারতম্য করা হয়। মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের এরূপ চাটুকারিতা বাংলার জনগণের মনে তীব্র আঘাত হানে। এছাড়া পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করায় জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।
২. নির্বাচন নিয়ে ছলচাতুরী/টালবাহানা : পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক আইনসভার মেয়াদ বৃদ্ধি করার ফলে ১৯৫৪ সালের আগে পূর্ব বাংলায় কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এমনকি প্রাদেশিক আইনসভার ৩৪টি আসন শূন্য থাকা সত্ত্বেও উপনির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়নি। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ নির্বাচন নিয়ে এরূপ টালবাহানার
কারণে পূর্ব বাংলায় তীব্র ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে উঠে। ফলে ১৯৫৪ সালের ৮ মার্চ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এ নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য পূর্ব বাংলার কয়েকটি বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়।
৩. মুসলিম লীগের অগণতান্ত্রিক মনোভাব : পাকিস্তান রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব বাংলার সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ শুরু করে এবং পূর্ব বাংলায় তাদের একক শাসন ও শোষণ টিকিয়ে রাখার নব নব কৌশল উদ্ভাবন করে। কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীর এরূপ বিমাতাসুলভ আচরণের ফলে তাদের শোষণের নগ্নচিত্র পূর্ব বাংলার জনগণের
নিকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব বাংলার কয়েকটি বিরোধী দলের সমন্বয়ে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়।
৪. পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন : তৎকালীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব বাংলার জনগণের কাছ থেকে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার নীতিতে বিশ্বাসী ছিল। তাই পূর্ব বাংলায় স্বায়ত্তশাসন বিকশিত হতে দেয়নি। অথচ পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক দলগুলো স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ ছিল। ১৯৫৪ সালের ৮ মার্চের নির্বাচনে এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়।
৫. রাজনৈতিক দমননীতি অবলম্বন : পাকিস্তান রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতি রাজনৈতিক দমননীতি অবলম্বন করে আসছিল। ১৯৫৪ সালের ৮ মার্চের নির্বাচনকে সামনে রেখে পূর্ব বাংলার জনগণ কেন্দ্রীয় সরকারের দমননীতির তীব্র বিরোধিতা করার সুযোগ পায় এবং ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুক্তফ্রন্ট গঠনের উদ্যোগ নেয়।
৬. ভাষা আন্দোলন : ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির মধ্যে আত্মসচেতনতা তথা বাঙালি জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করে। এ জাতীয়তাবোধ থেকে বাঙালি অন্য কোনো শাসকদের অধীন থেকে মুক্ত হওয়ার প্রয়াস পায়। ফলশ্রুতিতে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট।
৭. রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ঐকমত্য : ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে শুরু করে ৭ বছর যাবৎ মুসলিম লীগ তথা পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ ্ঠী পূর্ব বাংলার জনগণের ওপর যে নির্মম শোষণ চালিয়েছিল তা মোকাবিলা করার জন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠনের উদ্যোগ নেয়।
৮. যুক্তফ্রন্ট গঠন : ১৯৫৪ সালের ৮ মার্চ পূর্ব বাংলায় প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ঘোষণা করা হলে পূর্ব বাংলার নেতৃবৃন্দ মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্ট গঠনে তৎপর হন। সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ২১ দফার ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম ও গণতন্ত্রী পার্টির সমন্বয়ে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয়।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, মুসলিম লীগের অগণতান্ত্রিক আচরণ ও শোষণমূলক কার্যকলাপ বন্ধের উদ্দেশ্যেই ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর পূর্ব বাংলার নেতৃবৃন্দ ও রাজনৈতিক দলগুলো মিলে মুসলিম লীগ বিরোধী মোর্চা যুক্তফ্রন্ট গঠন করেছিলেন।

https://topsuggestionbd.com/%e0%a6%aa%e0%a6%9e%e0%a7%8d%e0%a6%9a%e0%a6%ae-%e0%a6%85%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%b7%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%8b/
admin

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!