অথবা, আল গাজালির মুসলিম রাষ্ট্রদর্শনে যে অবদান রয়েছে তা আলোচনা কর।
অথবা, মুসলিম রাষ্ট্রদর্শনে আল গাজালির অবদান ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন কর।
অথবা, মুসলিম রাষ্ট্রদর্শনে আল গাজালির অবদান বর্ণনা কর।
অথবা, মুসলিম রাষ্ট্রদর্শনে আল গাজালির অবদান বিশ্লেষণ কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
একাদশ শতকে মুসলিম দর্শন এক সংকটময় অবস্থায় বিরাজমান ছিল। মুসলিম দর্শনের এ সন্ধিক্ষণে যে মানুষটি আশার আলো নিয়ে আবির্ভূত হলেন তিনি ইমাম আল-গাজালি। নিঃসন্দেহে তিনি মুসলমানদের ইতিহাসে একজন শ্রেষ্ঠ ও সহানুভূতিশীল পণ্ডিত। তাঁর একনিষ্ঠ সাধনা, জ্ঞান ও গবেষণা মুসলিম জাতিকে অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়েছিল।
মুসলিম রাষ্ট্রদর্শনে আল-গাজালির অবদান : সমগ্র বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মৌলিক চিন্তাবিদ ইমাম আল- গাজালি মুসলিম চিন্তাবিদদের মধ্যে ছিলেন শ্রেষ্ঠ মনীষী। তিনি কেবলমাত্র সমকালীন চিন্তাধারা নিয়ে মুসলিম জাতিকে শ্রেষ্ঠ পথনির্দেশ দিয়েছিলেন তাই নয়; তিনি সামগ্রিক চিন্তাজগতেও কতকগুলো নতুনধারার জন্ম দিয়েছিলেন। তাই মুসলিম
রাষ্ট্রদর্শনে তাঁর অবদান চির উজ্জ্বল। নিম্নে মুসলিম রাষ্ট্রদর্শনে ইমাম আল-গাজালির অবদান আলোচনা করা হলো :
১. ধর্মান্ধতার অপসারণ : মধ্যযুগে মুসলিম সমাজে যে প্রবল ধর্মান্ধতা বিরাজমান ছিল তা অপসারণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আল-গাজালি। তিনি ছিলেন একজন ধর্মতত্ত্ববিদ, কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল কুরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে ধর্মতত্ত্বের বিকাশ। তিনি যুক্তিসর্বস্ব হতে কুরআন হাদিসের কার্যকরী, প্রাণবন্ত ও বাস্তবভিত্তিক অনুশীলনের দিকে মুসলমানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
২. দর্শনের সর্বজনীন রূপ প্রদান : আল-গাজালি দর্শনশাস্ত্রকে ভাষার মারপ্যাচ হতে মুক্ত করে সহজবোধ্য ভাষায়
সর্বসাধারণের সম্মুখে নিয়ে আসেন। তিনি তাঁর ‘তাহফাতুল ফালাসিফা’ গ্রন্থে দার্শনিক মতবাদকে আরও সুস্পষ্ট, বোধগম্য ও যুক্তিভিত্তিক করে তুলে ধরেন। এর ফলে দর্শনশাস্ত্র সর্বসাধারণের নাগালের ভিতর চলে আসে।
৩. সুফিবাদের যথার্থতা প্রমাণ : আল-গাজারি আবির্ভাবের পূর্বে অনেকেই সুফিবাদকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। আল-গাজালিই সর্বপ্রথম সুফিবাদকে ইসলামের অভিন্ন মতবাদ হিসেবে প্রতিপন্ন করেন এবং এটা যে ইসলামের বাতেনি বা গূঢ় দিক তা প্রমাণ করেন। ফলে তাঁর প্রচেষ্টা ও প্রভাবে ইসলামে সুফিবাদ সুনির্দিষ্ট ও সুনিশ্চিত আসন লাভ করে।
৪. গ্রিক প্রভাব মুক্ত : গাজালির সমসাময়িক সময়ে মুসলিম রাষ্ট্রদর্শনে গ্রিক দর্শনের প্রভাব ছিল লক্ষণীয়। এমতাবস্থায় গাজালি জনগণকে গ্রিক দার্শনিক চিন্তাধারা ও ভাববিলাসে পঙ্গুকারী প্রভাব থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি মুসলিম দর্শনকে কুরআন ও হাদিসের আলোকে ব্যাখ্যা করে জনগণকে গ্রিক দার্শনিক চিন্তাধারা থেকে মুক্ত
করেন। এভাবে তিনি মুসলিম দর্শনকে গ্রিক দর্শনের প্রভাব থেকে মুক্ত করেন।
৫. ভীতির পুনঃপ্রবর্তন : আল-গাজালি মনে করেন যে, আল্লাহর ভয় মানুষকে সংহত জীবনযাপনের নিশ্চয়তা প্রদান করে। তাই তিনি তাঁর ‘মানকিজ মিন জালাল’ গ্রন্থে মানুষের মনে আল্লাহর ভয় সৃষ্টির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন এবং তাঁর শিক্ষা ও উপদেশাবলিতে ভীতির পুনঃপ্রবর্তন করেন।
৬. ধর্ম ও দর্শনের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ : আল-গাজালি ধর্ম ও দর্শনকে পৃথকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি মনে করেন, দর্শন হচ্ছে মানব মস্তিষ্কের এক নবতর চিন্তা কৌশল, যা দ্বারা সত্যের অনুসন্ধান করা সম্ভব, কিন্তু সুনিশ্চিত সত্য অর্জন সম্ভব নয়। অন্যদিকে, ধর্ম হচ্ছে প্রত্যাদিষ্ট বিষয়নির্ভর। তাই তার দ্বারা যে সত্য লাভ করা হয় তা সংশয়হীন। এ
কারণে তিনি মনে করে, ধর্মের স্থান দর্শনের উপরে।
৭. জ্ঞানের উৎস ও মাধ্যম নির্ধারণ : আ ল-গাজালি মুসলিম দর্শনে ব্যাপক যুক্তিবাদী প্রবণতা লক্ষ্য করে জ্ঞানের

উৎস ও মাধ্যম সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি বলেন, প্রকৃত জ্ঞান লাভের একমাত্র উৎস হচ্ছে ওহি ইলহাত বা প্রত্যাদেশ এবং জ্ঞান লাভের মাধ্যম হচ্ছে কাশফ বা স্বজ্ঞা। জ্ঞানের উৎস ও মাধ্যম সম্পর্কে তাঁর সুনির্দিষ্ট মতামতের ফলেই মুসলিম দর্শন যুক্তিবাদী প্রভাব হতে
মুক্ত হয়।
৮. ধর্মানুশীলনের উপর গুরুত্ব প্রদান : আল-গাজালি মনে করেন যে, মানুষের নৈতিক জীবনযাপনের কার্যকরী প্রেরণাশক্তি হচ্ছে ইমান। তাই তিনি মানুষের মধ্যে ধর্মভাব দৃঢ় করার জন্য ইমানকে ভয় ও আশার মধ্যে সংস্থাপন করেন। এছাড়া জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধিনিষেধ, নিরমশৃঙ্খলা ও শরিয়তের আইনের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
৯. কুরআনের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা : কুরআনের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গাজালির অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তৎকালীন সময়ে কতিপয় মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা কুরআন ও এরিস্টটলের দর্শনকে অভিন্ন বলে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু গাজালি তাদের এ বক্তবকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে প্রমাণ করে কুরআনের মর্যাদা সংরক্ষণ করেন এবং ঐসব মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের ইসলামের দুশমন বলে অভিহিত করেন।
১০. ধর্মের যথার্থ মূল্যায়ন : আল-গাজালি বিশ্বাস করতেন যে, ধর্ম হচ্ছে আত্মার অভিজ্ঞতা। তাই বিধিবিধান ও মতবাদের চেয়ে ধর্ম ছিল তাঁর নিকট বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁর দার্শনিক চিন্তাধারায় ধর্মকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর এ চিন্তা মুসলিম দর্শনকে নতুনভাবে আলোচিত করেছিল এবং এতে মুসলিম দর্শন নতুনরূপে মূল্যায়িত
হতে থাকে।
১১. দার্শনিক মতবাদের মূল্যায়ন : গাজালি আশারি মতবাদের বেশকিছু বিষয়ে সংস্কার সাধন করেন। ফলে সুন্নি মুসলমানগণ আশারি গোঁড়ামি হতে মুক্তিলাভ করে। এছাড়া তিনি মুতাজিলা যুক্তিবাদের বিভ্রান্তি হতে সর্বসাধারণকে সতর্ক করার জন্য এ মতবাদের নিন্দা করেন।
১২. সামগ্রিক সমন্বয় বিধান : ধর্ম ও দর্শনকে প্রধানরূপে ব্যাখ্যা না করে গাজালি উভয়ের মধ্যে যৌক্তিক সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করেন। তিনি দর্শনের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা ও ত্রুটিবিচ্যুতি জনসম্মুখে প্রদর্শনের জন্য একে সর্বসাধারণের স্ত রে নিয়ে আসেন এবং তত্ত্ব ও বাস্তব কর্মধারা সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করেন।
উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনা হতে বলা যায় যে, ইসলাম ধর্মকে কুসংস্কারমুক্ত করতে এবং অনৈসলামিক রীতিনীতি দূর করে ইসলামকে পরিশুদ্ধ করার ক্ষেত্রে ইমাম আল-গাজালির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি তাঁর বহুমুখী প্রজ্ঞা ও যোগ্যতার গুণে যে মতবাদ দিয়েছেন এবং যেসব গ্রন্থাবলি রচনা করেছিলেন তাই ইসলাম ধর্মকে আরও গতিশীল করেছে।

https://topsuggestionbd.com/%e0%a6%9a%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a5-%e0%a6%85%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%86%e0%a6%b2-%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%bf/
admin

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!