অথবা, ভারতীয় দর্শনে মায়ার স্বরূপ আলোচনা কর।
অথবা, ভারতীয় দর্শনে বর্ণিত মায়ার প্রকৃতি বর্ণনা কর।
অথবা, মায়ার স্বরূপ সম্পর্কে ভারতীয় দার্শনিকদের অভিমত কী?
উত্তর৷ ভূমিকা :
ভারতীয় দর্শনে মায়া কথাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ভারতীয় দর্শনে মায়া শব্দটির একক কোন অর্থ নিরূপণ করা সম্ভব হয় নি। মায়া শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। বেদে, উপনিষদে, ভগবদগীতা, ব্রহ্মসূত্রে, গৌড়বাদের দর্শনে, শঙ্করের দর্শনে মায়া কথাটির ধারণা পাওয়া যায়। নিম্নে মায়া সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :
১. বেদে মায়া : বেদ অনুসারে মায়ার কোন নির্ধারিত অর্থ নেই। এটি একই অর্থে বিভিন্ন সময়ে ব্যবহৃত না হয়ে বরং বিভিন্ন অর্থে বিভিন্ন সময়ে ব্যবহৃত হয়েছে। ঋগবেদে ৭৫টি শ্লোকে মায়ার ১০০টি অর্থ রয়েছে।
প্রজ্ঞা হিসেবে মায়া : বেদের অভিধানে ১১টি প্রজ্ঞার নাম রয়েছে, যার একটি হচ্ছে মায়া। বেদে মায়াকে অনেক সময় মূর্তশক্তি, অনেক সময় বিমূর্ত (মানসিক) শক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার অনেক সময় উভয়কেই স্বীকার করা হয়েছে।
কপট হিসেবে মায়া : বেদে মায়াকে প্রজ্ঞার সাথে সাথে সমান্তরালভাবে কপট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মায়াকে কপট বিশ্বাসও বলা হয়।
রহস্যময়ী ও ঐদ্রোজালিক হিসেবে মায়া : অর্থববেদে মায়াকে রহস্যময়ী ও ঐন্দ্রোজালিক উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঋগবেদ অনুসারে ইন্দ্র বিভিন্ন রূপ ধারণ করতে পারে। এটি কোন দৈহিক শক্তির কারণে নয়, বরং ইচ্ছা শক্তির কারণে। সে ইচ্ছা করলেই বিভিন্নরূপ ধারণ করতে পারে। সেজন্য ইন্দ্রকে মায়া বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
শক্তি হিসেবে মায়া : বেদে মায়াকে মূর্ত ও বিমূর্ত উভয় শক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। চৈতরয়েও উপনিষদে মায়াকে স্বর্গীয় শক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এ শক্তি দৈহিক নয় বরং আধ্যাত্মিক ।
ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জ্ঞান হিসেবে মায়া : ঋগবেদের সায়াহ্ন মায়াকে কর্ম বিসর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন। এখানে মায়াকে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জ্ঞান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে আমরা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে জানতে পারে। বৈদিক আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে মায়ার স্বরূপকে দেখতে পাওয়া যায়।
বিস্ময়কর শিল্প হিসেবে মায়া : ঋগবেদের বিভিন্ন জায়গায় মায়াকে বিস্ময়কর শিল্প হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ঋগবেদের ১৬০.৪ অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে, দেবতাদের মধ্যে সেই বেশি শক্তিশালী বা দক্ষ যে দুটি অর্ধ বিশ্ব সৃষ্টি করতে পারে এবং সঠিক জ্ঞানের দ্বারা দুটি জগতকেই অক্ষত বা ধ্বংসহীনভাবে পরিমাপ বা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
২. উপনিষদে মায়া : একই নামে অথবা বিভিন্ন নামে মায়াকে বিভিন্ন উপনিষদে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এ হিসেবে বিভিন্ন উপনিষদে মায়ার অর্থ বিভিন্নরূপ। এমনকি একই উপনিষদে বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে মায়ার অর্থ বিভিন্নভাবে পরিলক্ষিত হয়।
প্রপঞ্চরূপে মায়া : শ্বেতাশ্বত উপনিষদে মায়াকে প্রপঞ্চ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। শঙ্করের মতে, জগৎ হচ্ছে হাসিকান্না, সুখদুঃখের সমষ্টি। অধিকাংশ পণ্ডিত ব্যক্তি শঙ্করের এ ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করেন এবং মায়াকে তারা জাগতিক বিভ্রান্তি বলে উল্লেখ করেন।
ভ্রমরূপে মায়া : মৈত্রী উপনিষদে বলা হয়েছে মানুষের দেহ হচ্ছে পঞ্চভূতের সমষ্টি। স্কুল ও ক্ষয়শীল দেহ। এ দেহটাকে পরিচালিত করে মন বা আত্মা। আবার এ দেহ মায়ার কারণে জগতের বিভিন্ন জিনিসের মোহে পড়ে মোহান্ধ হয়। রাতের মতো আবেগে অন্ধ হয়ে যায়। মায়ার কারণে দেহ বিভিন্নরূপ ধারণ করে। একজন অভিনেতা যেমন বিভিন্ন পোশাক

বদলায় ঠিক দেহটা হচ্ছে সেই রকম, যে বিভিন্ন সময়ে এক একটি জিনিসের প্রতি আসক্ত হয় এবং পূর্বেরটা ত্যাগ করে। মায়ার কারণে আবদ্ধ হয়ে দেহ মনকে ভ্রান্তিতে ফেলে দেয়। এখানে মায়াকে বলা হয় illusion বা অধ্যাস বা ভ্রান্তি ।
রহস্যরূপে মায়া : ‘সর্বোপরি’ শাস্ত্র একটি নাম করা গদ্য গ্রন্থ। এখানে মায়াকে একটি রহস্যময় শক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এ শক্তির দ্বারাই এ বিশাল জগতের সৃষ্টি হয়েছে। .
প্রকৃতি হিসেবে মায়া : শ্বেতাশ্বত উপনিষদে মায়াকে প্রকৃতি হিসেবে বলা হয়েছে। উপনিষদ গ্রন্থে মায়াকে জগৎ সৃষ্টির প্রধান কারণ বলা হয়েছে। বিভিন্ন উপনিষদে মায়াকে প্রকৃতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, মায়া ব্রহ্মের অতি মানবীয় ক্ষমতার বিভিন্ন আকার হিসেবে দেখানো হয়েছে। কোন অধ্যাস বা অবাস্তবতা হিসেবে নয়।
৩. ভগবদগীতায় মায়া : ভগবদগীতায়ও মায়া শব্দটির সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু ব্যাপক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় নি। তবুও ভগবদগীতায় মায়া কথাটি তিনটি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন-
ক. অতিপ্রাকৃত শক্তি হিসেবে মায়া : ভগবদগীতায় মায়াকে অতিপ্রাকৃত শক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে। গীতায় শ্রীকৃষ্ণও বলেছেন, “যদিও আমি অক্ষয় তবুও আমি মায়া শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।” এখানে মায়া অর্থে ব্রহ্মের অস্বাভাবিক বা অতিপ্রাকৃত ক্ষমতাকে বুঝানো হয়েছে। গীতায় আরো বলা হয়েছে যে, ব্রহ্ম সকল জীবজন্তুর আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং তার মায়া শক্তি সকল জীব জন্তুর মধ্যে নিহিত রয়েছে। এখানেও মায়াকে অতিপ্রাকৃত শক্তি বা ক্ষমতা অর্থে বুঝানো হয়েছে।
খ. প্রকৃতি রূপে মায়া : গীতায় প্রকৃতিকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ১. উচ্চতর প্রকৃতি- যার দ্বারা জগত চালিত হয় ও ২. নিম্নতর প্রকৃতি- এখানে প্রকৃতি অর্থে মায়াকে বুঝানো হয়েছে। এ মায়ার কারণে ভ্রান্তিতে পরিণত হয়।
গ. ব্যক্তি আত্মার অজ্ঞতা হিসেবে মায়া : গীতায় মায়াকে ব্যক্তি আত্মার অজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পি.ভি. শাস্ত্রীর মতে, জগতে মানুষ যে সকল ভ্রান্তিতে পতিত হয় তার মূলে রয়েছে মায়া। কৃষ্ণের মতে, মায়ার প্রভাবে মানুষ পশুর আচরণ করে এবং পার্থিব সুখশান্তিতে ডুবে থাকে এবং তারা আমার কথা ভুলে যায়।
৪. ব্রহ্মসূত্রে মায়া : ব্রহ্মসূত্রে ব্রহ্ম সম্পর্কিত ৫৫০টি সূত্র রয়েছে। এ ৫৫০টি সূত্রের একটি হচ্ছে মায়া সম্পর্কিত। এখানে মায়া কথাটি ভ্রম অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ম্যাক্স মূলারের মতে, মায়া হচ্ছে স্বপ্নের মতো, স্বপ্ন যেমন ক্ষণস্থায়ী এবং অবান্তর ব্যাপার তদ্রূপ মায়া হচ্ছে ক্ষণস্থায়ী এবং বাস্তবতার আলোকে মায়ার কোন মূল্য নেই। P.V. শাস্ত্রী বলেন, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে, মায়া কথাটির অর্থ হচ্ছে অধ্যাস যা অবান্তর স্বপ্নের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। স্বপ্ন যেমন মিথ্যা ও বাস্তবতা বর্জিত ঠিক তেমনি মায়াও মিথ্যা ও বাস্তবতা বর্জিত।
৫. গৌড়বাদের দর্শনে মায়া : গৌড়বাদের দর্শনে মায়া কথাটির ব্যাখ্যা রয়েছে। তার দর্শন পর্যালোচনা করলে মায়া কথাটির নিম্নলিখিত অর্থ পাওয়া যায়।
বহুত্বের জগৎ হিসেবে মায়া : গৌড়বাদের মতে, অদ্বৈত সত্তাই একমাত্র সত্য। জগতের বহুত্ব হলো অবভাস। গৌড়বাদের মতে, অবভাসিক জগতের কোন অস্তিত্ব নেই। আর এ বহুত্ব ভরা জগতের সৃষ্টি হয় মায়ার কারণে।
ব্যক্তি সত্তা হিসেবে মায়া : গৌড়বাদের মতে, প্রত্যেক ব্যক্তির কতকগুলো নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যে সকল বৈশিষ্ট্যের কারণে এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তি থেকে পৃথক হয়ে থাকে। এ যে এক ব্যক্তির সঙ্গে অন্য ব্যক্তির পার্থক্য তার মূলে রয়েছে মায়া। অর্থাৎ গৌড়বাদের মতে মায়ার কারণেই এক ব্যক্তির সঙ্গে অন্য ব্যক্তির পার্থক্য হয়ে থাকে।
প্রাণরূপে মায়া : গৌড়বাদের মতে, প্রাণের দুটি দিক রয়েছে। যথা : ১. ব্যাপ্ত ও ২. অব্যাপ্ত। এ প্রাণ যখন অব্যাপ্ত রূপে থাকে তখন গৌড়বাদ তাকে মায়া বলেছেন।
সৃষ্টির নীতি হিসেবে মারা : এ জগৎ ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু বেদান্ত দর্শন অনুযায়ী ঈশ্বর এ জগৎ সৃষ্টি করে নি। এ জগৎ মিথ্যা। এ মিথ্যা জগৎ মায়ার সৃষ্টি। আমাদের আত্মা কল্পনা করে বলে পৃথিবীকে ভ্রমাত্মক বলে মনে হয়।
মায়ার কারণে অদ্বৈতসত্তা বিভিন্ন রূপ ধারণ করে, জগৎ হচ্ছে মনের একটি প্রতিধ্বনি। সুতরাং এ জগৎকে আমরা যেভাবে দেখি
তা হলো আমাদের মন ও মায়ার সৃষ্টি জগৎ, অবভাসের জগৎ। সত্যিকারের জগৎকে আমরা দেখি না।
৬. শঙ্করের দর্শনে মায়া : শঙ্করের মতে, মায়া ব্রহ্মেরই এক রকম শক্তি এবং এটি অবর্ণনীয়। ব্রহ্মের এ মায়া শক্তি জাদুকরের জাদুশক্তির মতো মানুষকে ভ্রান্তিতে ফেলতে পারে। জাদুকর যেমন তার জাদুশক্তির বলে এটি টাকাকে অনেক টাকা দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করতে পারে, তেমনি ব্রহ্মও তার মায়া শক্তির দ্বারা অজ্ঞ মানুষকে অসত্য জগৎকে সত্য বলে মনে করাতে পারে। শঙ্কর আরো বলেন, জাদুকর যেমন তার জাদুশক্তির দ্বারা অন্য জাদুকরকে প্রতারিত করতে পারে না এবং নিজেও প্রতারিত হন না তেমনি ব্রহ্মও তার মায়া শক্তির দ্বারা কোন তত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তিকে ভ্রান্তিতে ফেলতে পারে না এবং নিজেও ভ্রান্তিতে পড়েন না। তত্ত্বজ্ঞানী শক্তি কেবল ব্রহ্মের সত্তা উপলব্ধি করেন, জগৎ এবং মিথ্যা মায়ার সত্তা উপলব্ধি করেন না। জাদুকর একটি টাকাকে বহু টাকা দেখাবার কারণ হলো তার জাদুশক্তি এবং মানুষের একটি টাকাকে বহু টাকা দেখিবার করাণ হলো অজ্ঞানতা। অনুরূপভাবে বলা যায়, ব্রহ্মের মায়া শক্তি জগৎ দেখায় আর সাধারণ মানুষ অজ্ঞ বলে তা দেখে। জাদুকর যেমন জানেন যে তার জাদুশক্তি ফাঁকি ছাড়া আর কিছুই নয় তেমনি ব্রহ্মও জানেন যে তার মায়াশক্তি কিছুই নয়।
রামানুজের দর্শনে মায়া : রামানুজের মতে, ঈশ্বরের সৃষ্টি এবং সৃষ্ট জগত যেমন সত্য তেমনি মায়াশক্তিও সত্য। মায়া সৎ এবং একভাবে পদার্থ। এ মায়া শক্তির দ্বারা ব্রহ্ম জগৎ সৃষ্টি করেন। রামানুজ ঈশ্বরের মায়াশক্তিকে বিস্ময়কর মায়াবীশক্তি বলে অভিহিত করেন।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ভারতীয় দর্শনে মায়া কথাটির একক কোন অর্থ নেই। ভারতীয় দর্শনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে এ মায়া কথাটির ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

https://topsuggestionbd.com/%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a6%b6-%e0%a6%85%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc-%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a4/
admin

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!