ডিগ্রি প্রথম এবং অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ ২০২৩ এর সকল বিষয়ের রকেট স্পেশাল ফাইনাল সাজেশন প্রস্তুত রয়েছে মূল্য মাত্র ২৫০টাকা প্রতি বিষয় এবং ৭ বিষয়ের নিলে ১৫০০টাকা। সাজেশন পেতে দ্রুত যোগাযোগ ০১৯৭৯৭৮৬০৭৯

 ডিগ্রী সকল বই

বৈষ্ণব দর্শনের প্রেমতত্ত্ব বিস্তারিত ব্যাখ্যা কর।

অথবা, বৈষ্ণন দর্শনের প্রেমতত্ত্ব বিস্তারিত আলোচনা কর।
অথবা, বৈষ্ণব দর্শনের প্রেমতত্ত্ব বিস্তারিত বর্ণনা কর।
অথবা, বৈষ্ণব দর্শনের প্রেমতত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা কর।
উত্তর।। ভূমিকা :
মধ্যযুগের বাংলার মরমিবাদের উষর ভূমিতে যে কয়টি দার্শনিক ও ধর্মীয় মতধারা উদ্ভব ও বিকাশ লাভ করে বাঙালির চিন্তাচেতনা ও জীবন আদর্শে প্রভূত প্রভাব রাখতে সক্ষম হয় তন্মধ্যে বৈষ্ণববাদ অন্যতম। বৈষ্ণববাদ মধ্যযুগের বাঙালির ধর্ম, সাহিত্য ও মনন সাধনার ক্ষেত্রে মহাভাব প্লাবন বইয়ে দেয়। বৈষ্ণব ধর্মমতের সার বা নিগূঢ় তত্ত্ব কথা নিয়েই গড়ে উঠেছে বৈষ্ণব, দর্শন বা বৈষ্ণববাদ। রাধাকৃষ্ণের প্রেমই বৈষ্ণবধর্ম ও দর্শনের মূল নির্যাস।
রাধাকৃষ্ণের পরকীয়া প্রেমের প্রতীকের অন্তরালেই বৈষ্ণব দর্শনের যাবতীয় তত্ত্ব ব্যাখ্যাত হয়েছে। তাই বৈষ্ণব দর্শনের অপর নাম প্রেম দর্শন অর্থাৎ প্রেমতত্ত্বই বৈষ্ণব দর্শনের মূল বা প্রধান তত্ত্ব। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবই বাংলায় বৈষ্ণবীয় প্রেমদর্শনের প্রবর্তক ও প্রতিষ্ঠাতা।
বৈষ্ণব প্রেমতত্ত্ব : বৈষ্ণব প্রেমতত্ত্বের মূলকথা দেহের মধ্য দিয়ে বিকশিত দেহোত্তীর্ণ অতীন্দ্ৰিয় প্রেম বা ঈশ্বর প্রেম। শ্রীকৃষ্ণ একমাত্র ঈশ্বর ও আরাধ্য কিন্তু তিনি প্রেমময়। তাঁকে লাভ করতে হয় প্রেম দিয়ে, ভালবাসা দিয়ে। তাই প্রেমই বৈষ্ণবের সাধনা, প্রেমই বৈষ্ণবের ধ্যান জ্ঞান। তবে বৈষ্ণবের এই প্রেম কোন মামলি, পার্থিব বা নর নারীর প্রেম নয়। এ প্রেম ঐশ্বী। পরম পুরুষ শ্রীকৃষ্ণকে উপলব্ধি করার তাঁর সাথে মিলিত হওয়ার প্রেম। এ প্রেমে জাতি, ধর্ম, কূল, শ্রেণির কোনো ভেদাভেদ নেই। তাইতো বৈষ্ণব তত্ত্ব দর্শনের মূলকথা জাতি নয়, শ্রেণি নয়, কূল নয়, ভক্তি এ প্রেমই মানুষের শ্রেষ্ঠ
পরিচয়, প্রেমই মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। বৈষ্ণবীয় এ প্রেমাত্মক দর্শনের প্রভাবে অতীতের জ্ঞানমূলক দর্শনে সসীম ও অসীম মানুষ ও দেবতার মধ্যে যে দুস্তর ব্যবধান ছিল তা ঘুচে গিয়ে স্বর্গ ও দেবতার সঙ্গে মানুষের দূরত্ব হ্রাস পেল উল্লেখযোগ্যভাবে এবং “দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা, এ বাণী স্বীকৃতি পেল ভক্ত ও ভগবানের সম্বন্ধের নির্যাস হিসেবে।
বৈষ্ণবীয় প্রেমের স্বরূপ : বৈষ্ণব দর্শনে পাঁচ প্রকার প্রেম বা ভাবের কথা স্বীকার করা হয়। যথা: শান্ত, দাস্য, সখ্য,বাৎসল্য ও মধুর। প্রতিটি ভাবই উৎকৃষ্ট ও আনন্দদায়ক। তবে প্রতিটি স্তরই পূর্ববর্তী স্তরের তুলনায় উচ্চ পর্যায়ের তবে কান্তাভাব ও মধুর ভাব এদের চেয়েও উন্নত ও উৎকৃষ্ট। কান্তা প্রেমকে বলা হয় সর্বসাধ্য সার। এ প্রেম কোনো সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ নয়। দাস্যপ্রেম প্রভু ভৃত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ সখ্য প্রেমে সখার সাথে সখা প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ বাৎসল্য প্রেম পিতামাতা ও সন্তানের পারস্পরিক হৃদয়ভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু কান্তা প্রেম ঈশ্বর সম্পর্কে। এ প্রেমের মধ্যে কোনো সীমার বন্ধন নেই । চৈতন্যের মতে, সৎ’, চিৎ ও আনন্দ পরমসত্তা শ্রীকৃষ্ণের স্বরূপ এবং হ্লাদিনী সম্বিনী ও সম্বিৎ তার শক্তি। প্রেমের উৎস হলো হ্লাদিনী শক্তি। প্রেমের আবির্ভাব ও বিকাশ ঘটে স্তরে স্তরে। প্রেমাবির্ভাবের প্রথম স্তরকে বলা হয় রতি। বর্তি থেকে শুরু করে প্রেম অগ্রসর হয় যথাক্রমে স্নেহ, মান, প্রণয়, রাগ, অনুরাগ ও ভাবের মধ্য দিয়ে সর্বশেষে তা চূড়ান্ত রূপ লাভ করে মহাভাব বা রাধাভাবে। হাদিনী শক্তি রাধার ধর্মই হচ্ছে কৃষ্ণকে সর্বাতিশয়ী সুখ প্রদান। তিনি কৃষ্ণ বাসনা পূরণ করেন বলেই তার নাম রাধা। তাইতো বৈষ্ণবরা বলেন “রাধা পূর্ণশক্তি, কৃষ্ণ পূর্ণশক্তিমান, দুই বস্তুতে ভেদ নাই শাস্ত্রের প্রমাণ।”
মহাভাব বা মহাপ্রেম : বৈষ্ণব প্রেমতত্ত্বে প্রেমের সর্বোচ্চ পর্যায় হচ্ছে মহাভাব বা মহাপ্রেম।শ্রীকৃষ্ণের নিষ্ঠাবান ভক্তগণ শান্ত, দাস্য, সখ্য ও বাৎসল্যভাব উত্তীর্ণ হয়ে ক্রমশ বিভোর হয়ে যায় মধুর মহাভাবে। এ প্রক্রিয়ায় ভজন করার নাম মধুর ভজন। মধুর ভজনের অন্য নাম গোপীভজন। এ ভজন নিঃস্বার্থ ও মধুর। মহাভাব অপার্থিব ও লোকাতীত। মহাভাব বা মহাপ্রেমের সাথে যুক্ত থাকে পরম আনন্দ। বৈষ্ণব মতে, “শ্রীকৃষ্ণের স্বরূপশক্তি হ্লাদিনীর প্রভাবে ভক্ত যদি
পরমসত্তার আনন্দঘন মূর্তি প্রত্যক্ষ করতে এবং বিশুদ্ধ আনন্দ অনুভব করতে পারে তবেই সে স্বাদ পেতে পারে যথার্থ মুক্তির। এই মুক্তি অবস্থায়ই ভক্ত আস্বাদন করে ভগবানের সাথে মিলনের পরমানন্দ্য।” এ পরমানন্দই হচ্ছে মহাভাব বা রাধাভাব। তবে বৈষ্ণবদের মহাপ্রেম দেহ নিরপেক্ষ নয় দেহকে কেন্দ্র করে এ প্রেমের সূত্রপাত হলেও বিকাশের উচ্চতর পর্যায়ে তা ক্রমশ অতিক্রম করে যায় দেহের বন্ধন এবং পরিণত হয় দেহোত্তীর্ণ অতীন্দ্রিয় প্রেমে।
প্রেম পরমসত্তার উপলব্ধির উপায় : বৈষ্ণবমতে, মানবসত্তা জ্ঞান, কর্ম ও প্রেম এ তিনটি বৃত্তি নিয়ে গঠিত। অভাব বা প্রয়োজন থেকে কর্মের সূত্রপাত ঘটে। কিন্তু ঈশ্বর বা পরমসত্তা পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাঁর কোনো প্রয়োজন বা অভাববোধ নেই বিধায় এ পথে ভগবৎ সাধনা বৃথা। আবার পারমার্থিক জ্ঞান সাধারণ মানুষের সাধ্যাতীত বলে সব মানুষের পক্ষে জ্ঞানের পথে পারমার্থিক সত্তার সন্ধান লাভ সম্ভব নয়। তাই বৈষ্ণব মতে, জ্ঞানের নয়, কর্মে নয়, প্রেম ভক্তির মাধ্যমেই কেবল সসীম মানুষের পক্ষে পরম ঐশীপ্রেম অর্জন ও উপলব্ধি করা সম্ভব। আর তাই প্রেমই বৈষ্ণবের ধর্ম, প্রেমই বৈষ্ণবের দর্শন।
স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্ক প্রেমের : বৈষ্ণব দর্শন অনুসারে রাধা সৃষ্টির প্রতীক। আর কৃষ্ণ পরম স্রষ্টা। এই দু’য়ের সম্বন্ধ জ্ঞানের নয়, প্রেমভক্তির সম্বন্ধ। তাঁদের ভাষায় পরমসত্তা কৃষ্ণ নির্গুণ ব্রহ্ম নন, বরং এমন এক পরম পুরুষ যিনি ভক্তের পরম আত্মীয় ভক্তের ভগবান। পরমসত্তা ভগবান ভেদবুদ্ধি বা জ্ঞানের বস্তু নয়, বরং পরম উপাস্য ও প্রেমের বস্তু।” তিনি রসস্বরূপ ‘রসো বৈ স:’। তিনি সবার প্রিয়, সবার বন্ধু, তিনি আত্মা স্বরূপ। তিনি আদিতে এক ছিলেন; কিন্তু জীবলীলা সদ্ভোগের জন্য তিনি সৃষ্টিকে নিজ থেকে পৃথক করে পরিণত হলেন বন্ধুতে। কেননা প্রেমসম্পদ ছাড়া প্রেম হয় না। দু’জনাতে একাত্ম না হলেও প্রেমভক্তি হয় না। এ কারণেই সত্তা সৃষ্টি থেকে পৃথক হলেন। আর তাই সৃষ্টি ও স্রষ্টা, রাধা ও কৃষ্ণ দুই হয়েও প্রেমে আবদ্ধ বা দুইয়ে মিলে এক। পরম পুরুষ কৃষ্ণ নিজ দেহে রাধাভাব অনুভব করেন। আবার রাধাকে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে কৃষ্ণ বেদনা বিধুর থাকেন। এভাবে কৃষ্ণ সৃষ্টি লীলাসহ নানান লীলা করে থাকেন ।
রাধাকৃষ্ণের প্রেমের প্রতীকী রূপ : বৈষ্ণব দর্শনে রাধাকৃষ্ণের পরকীয়া প্রেম দেহোত্তীর্ণ মহাপ্রেমের প্রতীকী রূপ মাত্র। এ পরকীয়া লৌকিক পরকীয়া নয়। ভক্ত ও ভগবানের যেখানে সেখানে লৌকিকতার প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক। লৌকিক বিচারও এখানে একবারেই সামঞ্জস্যহীন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন একজন পরম পুরুষ, সাধারণ পর পুরুষ নন। তাঁর মুরলি কোনো মামুলি বাস্তব বস্তু নয়। আরো বজ্র গোপীরাও সমাজের আর দশজন নারীর মতো নয়। আরো লক্ষ্য করার বিষয় যে, এখানে কেউই পরপুরুষের জন্য অপেক্ষমান লালসাবতী নারী নয়। সবাই নিষ্ঠাবান ঘরসংসারের প্রতি। একই সাথে সবাই সাড়া দিচ্ছে সৎ, চিৎ ও আনন্দের মূর্তিমান বিগ্রহ পরম পুরুষ শ্রীকৃষ্ণের আহ্বানে। দার্শনিক তত্ত্বের দিক থেকে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার আসল মানে হচ্ছে সচ্চিদানন্দস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক আপন আনন্দেরই এক অসাধারণ আস্বাদন। সাধারণ পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ায় এর অসাধারণ ব্যঞ্জনা উদ্ধার করা সম্ভব নয়। তত্ত্বের দিক থেকে রাধা হলেন কৃষ্ণের স্বকীয় শক্তির প্রকাশ এবং এ জন্যই তারা স্বকীয়। কিন্তু লৌকিক দৃষ্টিতে রাধা আনন্দঘোষের স্ত্রী আর তাই সাধারণ লৌকিক অর্থে পরকীয়া। প্রকৃত অর্থে রাধাকৃষ্ণের প্রেম লোকাতীত ও অপার্থিব। তাই প্রচলিত ভাষায় এর গাঢ়তা ও গূঢ়তা ব্যাখ্যা করা যায় না। এ প্রেম চির নবায়নযোগ্য ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। আর তাই তাতে তৃপ্তির কোনো ছেদ নেই। তাইতো বলা হয় ‘লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়া রাখলেও হিয়া জুড়ায় না জন্ম অবধি রূপ দেখেও নয়ন পরিতৃপ্ত হয় না।’ এ মহাপ্রেম মিস্টিকধর্মী দিব্যপ্রেম। প্রেমের এ পর্যায়ে ভগবান ও ভক্তের মধ্যকার সব ব্যবধান হয় সম্পূর্ণ তিরোহিত। বৈষ্ণবের ভাষায় একেই বলে শ্রীরাধার আত্মনিবেদন ও আত্মসম্পন। সুতরাং বৈষ্ণব দর্শনে রাধাকৃষ্ণের লৌকিক প্রেম দেহোত্তীর্ণ মহাপ্রেমের প্রতীকমাত্র। আর এই প্রেমে পাগল হয়ে শ্রীচৈতন্য দেব বলেছেন, “মুই সেই, মুই সেই।”
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষাপটে বলা যায়, প্রেমই বৈষ্ণবদর্শনের মূল কথা। প্রেমই বৈষ্ণবের ধর্ম,ধ্যান, জ্ঞান, সাধনা। বৈষ্ণবদর্শনের এ প্রেম মানব মানবীর প্রেমের প্রতীকে সূচিত হয়ে বিকাশের সর্বোচ্চ স্তরে অতীন্দ্রিয় মহাপ্রেমে উত্তীর্ণ হয়। এ প্রেমে জাত, ধর্ম বা বর্ণের তথাকথিত কোন বাধ বিচার নেই। তাইতো বৈষ্ণব মতে, জাতি নয়,শ্রেণি নয়, কুল নয়, ভক্তি ও প্রেমেই মানুষের শ্রেষ্ঠ পরিচয়, প্রেমই মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।



পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!