ডিগ্রি প্রথম এবং অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ ২০২৩ এর সকল বিষয়ের রকেট স্পেশাল ফাইনাল সাজেশন প্রস্তুত রয়েছে মূল্য মাত্র ২৫০টাকা প্রতি বিষয় এবং ৭ বিষয়ের নিলে ১৫০০টাকা। সাজেশন পেতে দ্রুত যোগাযোগ ০১৯৭৯৭৮৬০৭৯

 ডিগ্রী সকল বই

বাউল দর্শন কাকে বলে? বাংলাদেশে বাউল দর্শনের উদ্ভব ও ক্রমরিকাশ সম্পর্কে যা জান লিখ।

অথবা, বাউল দর্শন কী? বাংলাদেশে বাউল দর্শনের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে যা জান লিখ।
অথবা, বাউল দর্শনের সংজ্ঞা দাও। বাংলাদেশে বাউল দর্শনের উদ্ভব ও বিকাশধারা আলোচনা কর।
অথবা, বাউল দর্শন বলতে কী বুঝ? বাংলাদেশে বাউল দর্শনের উৎপত্তি ও বিকাশধারা সম্পর্কে ব্যাখ্যা কর।
উত্তর।৷ ভূমিকা :
বাউল দর্শন বাঙালির নিজস্ব মননে বিকশিত বাঙালির স্বকীয় জীবন বৈশিষ্ট্যপ্রসূত একটি দার্শনিক মতধারা। বাঙালির চিন্তা ও মননে প্রস্ফুটিত ও বাংলার মাটিতে, বাংলার আবহে বিকশিত বাঙালির নিজের দর্শন, আপন দর্শনই হচ্ছে বাউল দর্শন। মধ্যযুগের শেষ অন্তে বাংলার বর্ণবিভক্ত সমাজ কাঠামোতে একেবারেই নিম্নবর্ণের অধিকার বঞ্চিত সাধারণ মানুষের জগৎ ও জীবন সম্পর্কিত বাস্তবমুখীন চিন্তাধারার সুস্পষ্ট প্রতিফলন হচ্ছে বাউল ধর্ম ও দর্শন। তাই বলা যায়, বাঙালির নিজস্ব জীবনবোধ ও বাস্তব সমাজ প্রেক্ষাপট থেকেই বাউল দর্শনের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে। যদিও বাউল দর্শন তার উদ্ভব ও বিকাশ ধারায় বাংলার প্রচলিত বিভিন্ন ধর্ম ও দর্শনের নির্যাসকে গ্রহণ করেছে তবে কোনো ধর্ম বা দর্শনের মধ্যে তার সত্তাকে হারিয়ে ফেলেনি, বরং সকল ধর্ম ও দর্শন থেকে নির্যাস নিয়ে নিজের মতো করে বিকাশ লাভ করেছে।
বাউল দর্শন : বাঙালির নিজস্ব মনন বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে বাংলার নিজস্ব আবহে বিকশিত একটি সাধন আশ্রয়ী মরমি আদর্শিক চিন্তাধারা হচ্ছে বাউল দর্শন। ড. মোঃ সোলায়মান আলী সরকারের মতে, “বাংলার এক শ্রেণির অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত একতারা আশ্রয়ী, ভাববিদ্রোহী গায়ক স্বাধীন ও সমন্বয়মূলক মরমি সাধকদের আত্মোপলব্ধিমূলক চিন্তাধারার নাম বাউল দর্শন। বাউল দর্শন মূলত একটি মরমি চিন্তাধারা যা কিছু গুহ্য যোগক্রিয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত। বাউলরা জগৎ …সংসারকে উপেক্ষা করে আধ্যাত্মিক ধ্যানে মগ্ন থাকেন। বাউলদের আধ্যাত্মিক সাধনার মূল কেন্দ্রভূমি হচ্ছে দেহ। তাঁরা বিশ্বাস করেন, পঞ্চন্দ্রিয় যুক্ত দেহ সকল শক্তির আধার এবং আধ্যাত্মিক সাধনার একমাত্র অবলম্বন। মূলতত্ত্ব আত্মা, পরমাত্মা, মনের মানুষ, পরম গুরু, পরম তত্ত্ব সবকিছুই এই দেহে মিলে। তাই তারা দেহের সাধনার মাধ্যমেই পরমতত্ত্ব বা মনের মানুষকে খুঁজে বেড়ান। বাউলদের দেহ সাধনা, জ্ঞান, কর্ম, ভাব, ভক্তি ও প্রেমের উপর প্রতিষ্ঠিত। বাউলরা জ্ঞান, কর্ম, ভাব, ভক্তি ও প্রেমের সংমিশ্রণে নিবিষ্টচিত্তে মনের মানুষকে সন্ধান করেন তাঁর নিজ দেহের মধ্যেই। কেননা তাঁরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন
“আপন ভাণ্ড খুঁজলে পরে সকল জানা যায়।” বাউল দর্শন অসাম্প্রদায়িক চেতনাই বিশ্বাসী জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণের বিভেদ বাউলদের নেই। তাই বাংলায় হিন্দু মুসলমান উভয় ধর্মের অনুসারী বাউলই দেখতে পাওয়া যায়। বাউল গানের মধ্য দিয়েই বাউলদের জী দর্শনের অভিব্যক্তি ঘটে। বাউল দর্শনের বিশিষ্ট লক্ষণ ঐকান্তিক উপলব্ধি ও প্রত্যক্ষ উপলব্ধি।
বাউল দর্শনের উদ্ভব ও বিকাশ : মধ্যযুগের বাংলার মরমিবাদের ঊষর ভূমিতে বাউল ধর্ম ও দর্শনের উদ্ভব। তৎকালীন বর্ণ বিভক্ত সমাজের প্রচলিত ধারার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকে বাউল ধর্ম ও দর্শন মতের উদ্ভব। সামাজিক শোষণের বিপরীতে বিদ্রোহী হয়ে সমাজের একদল মানুষ নিজেদেরকে সমাজের প্রতিপক্ষ ভেবে স্বেচ্ছা সমাজ বর্জন করে প্রচলিত সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে একপ্রকার প্রতিবাদ সৃষ্টি করে। সেই প্রতিবাদের ফসল হিসেবেই সমাজে প্রোটেস্ট্যান্ট গ্রুপ হিসেবে বাউলদের আবির্ভাব। এ প্রসঙ্গে ড. আনোয়ারুল করিম যথার্থই মন্তব্য করেছেন, “বাউল সাধনাকে এমনি
একটি প্রতিবাদী মতাদর্শ বলা যেতে পারে, যা সর্বোতভাবে অধ্যাত্মচেতনাবাদী, নিম্ন শ্রেণির মানুষ এই মতাদর্শ গড়ে নিয়েছে একটি প্রতিবাদী আদর্শে এই মতাদর্শ। সমাজের প্রবঞ্চিত মানুষের একদিন প্রতিদিন বেঁচে থাকার প্রেরণাস্থল। এ সাধনার উৎস কোন বিশেষ একটি ধর্ম বা সমাজে নিহিত নয়। এর ইতিহাসও তাই একটি বিশেষ সময়ে খোঁজানিরর্থক তবে সাধারণভাবে খ্রিস্টীয় ষোড়শ বা সপ্তদশ শতকেই বাউল মতের উদ্ভবকাল বলে মনে করা হয়। অবশ্য এ নিয়েও পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে। ড. আহমদ শরীফ এর মতে সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়পাদে মুসলমান রমণী মাধববিবির শিষ্য নিত্যানন্দ পুত্র বীরভদ্রের হাত ধরেই বাউল দর্শনের যাত্রা শুরু এবং উনিশ শতকে লালন শাহের গানের মাধ্যমে তা পরিপূর্ণতা লাভ করে। বাউলরা তাদের আদি পুরুষ হিসেবে বীরভদ্রকেই মানে। তবে অনেক পণ্ডিত বিশেষ কোন একজন ব্যক্তিকে বাউল মতের প্রতিষ্ঠাতার শিরোপা দিতে নারাজ। এই পণ্ডিতেরা মাধবেন্দ্রপুরী, ঈশ্বরপুরী চৈতন্যদেব, অদ্বৈতাচাৰ্য্য হতে আরম্ভ করে নিত্যানন্দ পুত্র বীরভদ্র বা বলভদ্র পর্যন্ত অনেককেই এই মতের প্রতিষ্ঠাতা বলে মনে করেন। আবার ড. এনামুল হক বাউল মতের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কোনো ব্যক্তিকে মানতে নারাজ। তিনি বলেছেন এই মতবাদ যেহেতু কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মতবাদ নয় তাই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টির দ্বারা এটা প্রতিষ্ঠিত হবার সম্ভাবনা খুবই কম। তিনি বাংলাদেশে বাউল মতের আবির্ভাব কালকে কোনোমতেই ষোড়শ শতকের চেয়ে পুরনো নয় বলে মতপ্রকাশ করেন। তিনি তাঁর মতের পক্ষে ঐতিহাসিক যুক্তিকে প্রামাণিক ধরে দেখান যে, বাংলাদেশে বৈষ্ণব মতবাদের উদ্ভবের পূর্বে আউল, বাউল, কর্তাভজা, সাঁই, নেড়া, ফকির, জিকির প্রভৃতি কোনো মতবাদই দেখা দেয় নাই। তাঁর মতে বাংলাদেশে ইসলাম আবির্ভাবের পরে সুফি মতবাদের প্রভাবে এদেশে লোকায়ত বিশ্বাসের ক্ষেত্রে এক ধরনের জাগরণ আসে এবং খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে ইসলামি সুফিবাদ ও বৈষ্ণববাদের প্রভাবে নিরক্ষর শ্রেণির ভেতরে যে মরমিমুখী চিন্তার স্ফুরণ ঘটে তাই বাউল মত।’ তবে বাউল সম্প্রদায়ের উদ্ভবের ইতিহাস যাই হোক না কেন এটা যে বাংলার মাটির দর্শন, বাংলার মানুষের এবং আমাদের সমাজ অভিজ্ঞতাজাত অর্থাৎ বাঙালির দর্শনজাত বাউল মতের উদ্ভব নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও বাংলায় বাউল মতের সর্বোৎকৃষ্ট বিকাশ ঘটে বাউল সাধক লালনের হাত ধরে । উনিশ শতকে লালন শাহের গানের মধ্য দিয়ে বাউল ধর্মমত ও দর্শন পূর্ণতা লাভ করে। বাংলায় বাউল বলতে আমরা লালন সাঁইজিকেই বুঝি এবং বাউল দর্শন বলতে তাঁর গানকেই জানি। লালন শাহ আদি বাউলও নন এবং বাউল দর্শনের আদি প্রচারক এবং প্রবর্তকও নন; তথাপি লালন বাউল ধর্ম ও দর্শনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ললিন সাঁইয়ের জন্ম আনুমানিক ১৭৭৪ সালে। লালন শাহ তাঁর চিন্তা, সাধনা বিশেষ করে গানের মাধ্যমে বাউল মতকে বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে দেন। তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বাংলা নিম্নবর্ণের লোকদের একটা বিশেষ অংশ বাউল ধর্মমতে দীক্ষিত হন এবং পরে তারা বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে বাউল মতাদর্শ সমগ্র বাংলায় চূড়ান্ত বিকাশ লাভ করে। এমনকি আজ যে বাউল দর্শন বিশ্বজনীনতা লাভ করছে তাও লালন শাহেরই অবদান। লালন শাহের মৃত্যুর পর বাংলায় বাউল মতধারা আবার স্তিমিত হয়ে পড়তে শুরু করে।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় বাংলায় বাউল মতের উদ্ভব পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যে। মুসলমান মাধববিবি এই মতবাদের প্রবর্তক এবং তাঁর শিষ্য বীরভদ্র এ মতের আদি প্রচারক হলেও উনিশ শতকের বাংলায় লালন ফকিরের সাধনা ও সৃষ্টির মাধ্যমেই এর পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে।



পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!