ডিগ্রি প্রথম এবং অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ ২০২৩ এর সকল বিষয়ের রকেট স্পেশাল ফাইনাল সাজেশন প্রস্তুত রয়েছে মূল্য মাত্র ২৫০টাকা প্রতি বিষয় এবং ৭ বিষয়ের নিলে ১৫০০টাকা। সাজেশন পেতে দ্রুত যোগাযোগ ০১৯৭৯৭৮৬০৭৯

 ডিগ্রী সকল বই

বাউল দর্শনে স্বীকৃত তত্ত্বসমূহ আলোচনা কর ।

অথবা, বাউল সাধকদের অনুশীলিত তত্ত্বসমূহ ব্যাখ্যা কর।
অথবা, প্রধান প্রধান বাউল তত্ত্বসমূহ আলোচনা কর।
অথবা, বাউলবাদে আলোচিত তত্ত্বসমূহ তুলে ধর।
অথবা, বাউল সাধকদের অনুশীলিত তত্ত্বসমূহ সম্পর্কে যা জান লেখ।
উত্তর।৷ ভূমিকা :
ড. আহমদ শরীফের মতে, বাউল মতো বাংলার ধর্ম, বাঙালির ধর্মী একান্তভাবে বাঙালির মানস ফসল। বাঙালির নিজস্ব মনন বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে বাংলার নিজস্ব আবহে বিকশিত একটি সাধনকেন্দ্রিক মরমি আদর্শিক ভাবধারা হচ্ছে বাউলবাদ। মধ্যযুগীয় বাংলার বর্ণ বিভক্ত সমাজের নিম্নবর্ণের অতি সাধারণ মানুষের জগৎ জীবন চিন্তার বাস্তব প্রতিফল ঘটেছে বাউলবাদে। বাউলরা মূলত একটি সংগীত আশ্রয়ী সাধনভিত্তিক সম্প্রদায়। সাধনাই বাউলের সমগ্র জীবনের মূল ব্রত। দেহের সাধনাই হচ্ছে বাউল সাধনা। বাউলদের এ দেহ সাধনা জ্ঞান, কর্ম, ভাব, ভক্তি ও প্রেমের উপর প্রতিষ্ঠিত আত্মতত্ত্ব জানার সাধনা যা ক্রমান্বয়ে দেহ হতে দেহাতীত অধ্যাত্ম তত্ত্বের সহজ জ্ঞানলাপে সাহায্য করে। বাউলদের সাধনার কোনো একটি একক নির্দিষ্ট পদ্ধতি নেই তথাপি সাধনার ক্ষেত্রে বাউলরা কতিপয় অভিন্ন তত্ত্বকে স্বীকার করে নেয়।
বাউল তত্ত্ব : বাউল সাধনা মূলত দেহভিত্তিক। বাউলরা মানবদেহকেই তাঁদের সমগ্র ক্রিয়ার কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করে। বাউলদের এ দেহকেন্দ্রিক সাধন প্রণালিতে আবহমান বাংলায় বিকশিত ও বহিরাগত নানা মত ও তত্ত্বের প্রভাবহেতু তা নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি কিন্তু তা সত্ত্বেও বাউল সাধন প্রণালিতে কিছু অভিন্ন তত্ত্বকে স্বীকার ও অনুশীলন করা হয়। বাউল দর্শনে অনুসৃত এ তত্ত্বসমূহই বাউল তত্ত্ব নামে পরিচিত। নিম্নে এগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো :
১. দেহ তত্ত্ব বা ভাও ব্রহ্মাওবাদ : মানবদেহ বাউল ধর্ম, দর্শন ও সাধনার মূলভিত্তি দেহের সাধনাই বাউল সাধনা বাউল মতে, পঞ্চেন্দ্রিয়যুক্ত দেহ সকল শক্তির আধার এবং আধ্যাত্মিক সাধনার একমাত্র অবলম্বন। দেহের তুষ্টিতেই সকল সাধনার তুষ্টি। বাউলদের কাছে মানবজীবন ও মানব দেহ পরম সম্পদ দেহের অভ্যন্তরেই সকল বস্তু বিদ্যমান। এ দেহের মধ্যেই মূলতত্ত্ব, আত্মা, পরমাত্মা, পরমগুরু ও পরম তত্ত্বের বাস, তীর্থ ধর্ম, বারব্রত, পূজা, জব, তপ, ইত্যাদি সমস্তই দেহে মিলে, দেহের সাধনা সর্ব সাধনার শ্রেষ্ঠ সাধনা মানব দেহকে আশ্রয় করেই মানুষের প্রেম ও সাধন ভজন। মানুষের মধ্যেই সোনার মানুষ, মানুষ রতন, মনের মানুষ, নূরনবী ইত্যাদির সন্ধান পাওয়া যায়। তাই তাঁরা দেহের সাধনার মাধ্যমেই মনের মানুষের সন্ধান করেন। দেহ সম্পর্কে বাউলদের মূল বক্তব্য হলো “যাহা নাই ভাণ্ডে, তাহা নাই ব্রহ্মাণ্ডে।” অর্থাৎ মানব দেহের বাইরে বা ভাণ্ডের বাইরে কিছুই নেই। বাউলরা দেহের মধ্যে বিশ্বের মূল উৎসের সন্ধান পান। মানবদেহ ক্ষুদ্র ব্রহ্মাণ্ড, দেহের মধ্যে যেমন পরম তত্ত্ব বা পরমাত্মার বাস তেমনি এ মানবদেহের মধ্যে যেমন পরম তত্ত্ব বা পরমাত্মার বাস তেমনি এ মানবদেহের মধ্যে মাটি, জল, তেজ, বায়ু, ব্যোম, সপ্তপাতাল, সপ্ত ঊর্ধ্বলোক, সপ্তদ্বীপ, সপ্তসাগর ইত্যাদি আছে। অর্থাৎ মানবদেহ একটি ক্ষুদ্র বিশ্ব। তাই লালন বলেন, “যে লীলে ব্রহ্মাণ্ডের পর সেই লীলে ভাও মাঝার।”
২. প্রকৃতি সাধন তত্ত্ব : প্রকৃতি সাধনা তথা পুরুষ ও প্রকৃতির মিলনজাত সাধনা বাউল সাধনার অপরিহার্য অঙ্গ। সাধারণভাবে প্রকৃতি বলতে নারীকে এবং প্রকৃতি সাধনা বলতে নারী পুরুষের মিলিত সাধনাকেই বুঝায়। কিন্তু বাংলার বাউলকুল শিরোমণি লালনশাহ্ প্রকৃতি শব্দটি নানা অর্থে ব্যবহার করেছেন। যেমন- নারী, জড়, বিশ্বজগৎ, মা ফাতেমা, জগৎমাতা, আদ্যমাতা, পরাপ্রকৃতি, মহামায়া, নূর নূরনবী, নূর জহুরা, বস্তু ইত্যাদি। প্রকৃতির সত্তা রজঃ ও পুরুষে সা বীজে। রজঃকে ‘নীর’ ও ‘শুক্রকে ‘ক্ষীর’ বলে অভিহিত করে বাউলরা ‘রজঃবীজ’ বা ‘নীর-ক্ষীর’ মিলিত সত্তাকে সহজ
মানুষের স্বরূপ বলেন, আর এ নীর-ক্ষীরের মিলিত সাধনাই বাউলদের প্রকৃতি সাধনা, বাউলরা বিশ্বাস করে যে, অমাবস্যা পূর্ণিমার মহাযোগে পুরুষ ও প্রকৃতির মিলন সাধনা করে ইড়া পিঙ্গলা পথ ত্যাগ করে মধ্যপথ সুষম্না পথে বায়ু চালনা করে মূলাধার হতে ক্রমশ ঊর্ধ্বপথে ভূমধ্যে আজ্ঞাচক্রে ‘অটল মানুষ’ ও সহজ মানুষের মিলন ঘটানো সম্ভব হয়। এ মিলন পুরুষ ও প্রকৃতির মিথুন জাত সহজ ও আনন্দময় অবস্থা। এ পরমানন্দ সহজ বা সহজ সত্তা। আর এ সহজকে ধরার জন্যই বাউলরা অমাবস্যা পূর্ণিমা যোগে তথা ‘অমাবস্যা প্রতিপদ দ্বিতীয়ার প্রথমে ত্রিবেণীর ঘাটে বাস সাধনা করে থাকে। কিন্তু এ সাধনা সকল বাউলের জন্য অপরিহার্য নয়। হিন্দু ও বৈষ্ণব হিন্দু বাউলরা প্রকৃতি সাধনার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করলেও মুসলমান বাউলদের মধ্যে এ সাধনা দুর্লক্ষ্য।
৩. চারচন্দ্রভেদ তত্ত্ব : বাউল মতে, মানবদেহে চারচন্দ্রের অবস্থান। দেহের মধ্যে চারচন্দ্র আছে চিরদিন। বাউলদের এ চারচন্দ্র হচ্ছে শুক্র, রজঃ, বিষ্ঠা ও মূত্র। অবশ্য চন্দ্রভেদ কথাটি সকলের নিকট সমান অর্থ বহন করে না। চাঁদ বা চন্দ্ৰ শব্দ নানা অর্থে ব্যবহৃত হয়। ড. ভট্টাচার্য ‘চন্দ্র’ শব্দের বিভিন্ন ব্যবহার লক্ষ করেছেন, যেমন- ১. শুক্র; ২. পরমতত্ত্ব; ৩. মনের মানুষ, সহজ মানুষ, প্রেমের মানুষ, মানুষ রতন ইত্যাদি; ৪. নিষ্কাম প্রেম, প্রেমরত্ন ধন; ৫. সাধনালব্ধ প্রত্যক্ষ অনুভূতিজাত জ্ঞান, সহজ জ্ঞান, তত্ত্ব জ্ঞান ইত্যাদি; ৬, চন্দ্রবৎ জ্যোতির্ময় পদার্থ, মন; ৭. দেহের চারচন্দ্র শুক্র, রজঃ, মল ও মূত্র। আবার ‘ভেদ’ কথাটিও সকলে একই অর্থে গ্রহণ করেন না। হিন্দু বাউলদের নিকট ভেদ অর্থ ‘পান করা’। অর্থাৎ চারচন্দ্রভেদ বলতে তারা শুক্র, রজঃ, মল ও মূত্র এ চারটি বস্তুকে গ্রহণ বা পান করাকে বুঝেন। হিন্দু বাউলরা অমাবস্যা পূর্ণিমা যোগে প্রকৃতি আশ্রয়ী হয়ে সাধনা করে। তাঁরা সাধনা করতে গিয়ে ত্রিবেণীয় ঘাট বন্ধনা করে প্রথম দিনের প্রথম অংশে তাঁরা পান ক্রিয়া অনুষ্ঠান করে, দ্বিতীয় দিনে গুরুভেদ ও সম্প্রদায়ভেদ পান করে, তৃতীয় দিনে পান ক্রিয়া অনুষ্ঠান বন্ধ করে। মুসলমান বাউলরাভেদ অর্থে পান করেন না বা পান ক্রিয়া অনুষ্ঠানও করে না। তবে অধিকাংশ বাউল সাধক মনে করেন যে, একে অন্যের চারিচন্দ্র গ্রহণে সাধক সাধিকা উভয়ের দেহই পরিপক্ক হয় এবং দেহে একটি স্থির অচঞ্চল শক্তির সঞ্চার হয়। তবে সিদ্ধ বাউল হওয়ার জন্য চারচন্দ্রভেদ সাধনা অপরিহার্য বা আবশ্যক নয়।
৪. মনের মানুষ তত্ত্ব : বাউলরা মানবদেহস্থিত আত্মারূপী পরমাত্মাকে ‘মনের মানুষ’ বলে অভিহিত করেন। তাঁরা এ মনের মানুষকেই খুঁজে বেড়ান মানবদেহের মধ্যে। এ দেহের মধ্যেই তাঁরা আকাশ ও পৃথিবীকে কল্পনা করেন। এ দেহের মধ্যেই তাঁরা স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ রূপ লক্ষ করেন। এ দেহের মধ্যেই পরম সুন্দর বা স্রষ্টার বাস এ তাঁদের বিশ্বাস। এ বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরেই তাঁরা দেহের সাধনায় লিপ্ত হন। তাঁরা মনে করেন দেহের সাধনার দ্বারাই মনের মানুষের দেখা পাওয়া যায়। বাউলদের এ মনের মানুষ তত্ত্বেরই স্পষ্ট অভিব্যক্তি ঘটেছে লালনের গানের নিম্নোক্ত দুটি লাইনে-
“—– মনের নিষ্ঠা হলে মিলবে তারি ঠিকানা,
বেদ-বেদান্ত পড়বে যত বাড়বে তত লাঞ্ছনা।”
৫. গুরুবাদ বা মুর্শিদ তত্ত্ব : বাংলার বাউলরা একটি গুরুবাদী বা পীরবাদী সম্প্রদায়। যিনি বা যারা সাধনার মাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতার দ্বারা আধ্যাত্মিক সত্য লাভ করেন তিনি বা তাঁরাই গুরু বা মুর্শিদ । বাউল সাধনাই গুরুকে সর্বোচ্চে স্থান দেয়া হয়। মুর্শিদই বাউলের সাধন পথের সঙ্গী। পথপ্রদর্শক তাঁর সহায়তা ব্যতীত বাউলের সাধনা পূর্ণতা পায় না। তাইতো বাউল সম্রাট লালন শাহ বলেন, “গুরুপদে নিষ্ঠা মন যার হবে, যাবে তার সর্বস্ব সার অমূল্য ধন হাতে সেই পাবে। শুরু যার হয় কাঝারি, চালায় তার অচল তরী, ভব-তুফান বলে ভয় কিতারি, নেচে গেয়ে ভব পারে যাবে, আগমে নিগমে তাই কয়, গুরুরূপে দ্বীনদয়াময়” শুরু বলতে বাউলরা মানবগুরুকে বুঝেন। তবে এ মানবগুরুকে তারা আবার ঈশ্বররূপেও
কল্পনা করেন। এ শুরু বাউল শিষ্যদের ‘রাগের আচার পদ্ধতি শিক্ষাকে বাউল সাধক সাধিকার অন্তর্জীবন ও বহির্জীবন শুরুর নিকট সদা উন্মুক্ত।
৬. রূপস্বরূপ তত্ত্ব : রূপস্বরূপ তত্ত্ব বাউল সাধনার অপরিহার্য অঙ্গ। বাউল মতে, রূপ বাইরের একটা আকার মাত্র। এ রূপাশ্রিত নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে যে সত্তার বাস সেটাই স্বরূপ। অর্থাৎ রূপের মধ্যেই স্বরূপের বাস। কিন্তু এ স্বরূপকে প্রাপ্তির উপায় কি? বাউল মতে, কোনো আকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে চিরন্তন আকারহীন সত্তার মধ্যে বিলীন হলেই স্বরূপপ্রাপ্ত হওয়া যায়। আর এ স্বরূপপ্রাপ্ত অবস্থাকেই বাউল দর্শনে জ্যান্তে মরা বলা হয়। বাউল সাধনার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে রূপ থেকে স্বরূপে উত্তীর্ণ হওয়া। অর্থাৎ জ্যান্তে মরা অবস্থা প্রাপ্ত হওয়া। এ অবস্থা প্রাপ্তির জন্য বাউলদের সাধনা নরনারীর দৈহিক মিলনের মধ্য দিয়েই শুরু হয়। আর এ মিলন যখন কামরসোত্তীর্ণ হয়ে যথার্থ প্রেমে রূপ নেই তখনই স্বরূপের সন্ধান পাওয়া যায়। অর্থাৎ দেহভিত্তিক সাধনার মাধ্যমে রূপকে অতিক্রম করে স্বরূপের সন্ধান পাওয়ার মাধ্যমেই এ অবস্থা প্রাপ্তি ঘটে।
৭. পরমতত্ত্ব : বাউল সাধনা প্রধানত দেহভিত্তিক। কিন্তু তাঁদের এ দেহ সাধনার মূল লক্ষ্য বা নিগূঢ় উদ্দেশ্য কি? এ প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করলে দেখা যায় পরমতত্ত্ব বা পরমাত্মার অন্বেষণই বাউলদের দেহ সাধনার নিগূঢ় লক্ষ্য বাউলদের দেহ সাধনা রজঃ বীজের সাধনা হলেও প্রকৃতপক্ষে তা মানবাত্মা, পরমাত্মা বা পরম তত্ত্বের উপলব্ধির সাধনা। তাইতো লালন বলেন, “আত্মতত্ত্বে ফাজিল যে জনা, জানতে পারে সে নিগূঢ় কারখানা।” আত্মতত্ত্বের সাধন পদ্ধতি বিচারে বাউলরা দু’ভাগে বিভক্ত, যথা : মুসলমান বাউল বা ফকির ও হিন্দু বা বৈষ্ণব বাউল। মুসলমান বাউলদের পরমতত্ত্ব নানা স্থানে বিভিন্নরূপে বিভিন্ন মোকাম, মঞ্জিল, দায়রা, দল, পদ্মচক্রে নানাভাবে প্রকাশিত হয়। তাঁরা মনে করে, জীবাত্মার মধ্যেই পরমাত্মার স্থিতি। কাজেই আত্মার পরিশুদ্ধিই খোদাপ্রাপ্তির উপায়। তাই আত্মার স্বরূপ উপলব্ধির সাধনাই এদের প্রাথমিক ব্রত। হিন্দু বাউলদের পরম সত্য এক অদ্বয় মহানন্দ সহজ স্বরূপ। এ অদ্বয় তত্ত্বের দুটি ধারা, একটি কৃষ্ণ তত্ত্ব, অপরটি রাধাতত্ত্ব। রাধাকৃষ্ণের প্রেম মিলনের মধ্য দিয়েই তাঁরা সহজ আনন্দ বা পরম তত্ত্বের সাধনা করেন।
৮. প্রেমতত্ত্ব : প্রেম বাউল ধর্ম ও সাধনার মূলতত্ত্ব। বাউল মতে, প্রেমহীন জীবন সকল প্রকার সাধনার অন্তরায়। প্রেমে তন্ময়তার মধ্য দিয়েই বাউলরা পরমাত্মা বা পরম তত্ত্বের সাথে একাত্ম হতে চান ও উপলব্ধি করতে চান। বাউলরা প্রেমে পাগল, তবে তাঁরা ভবের প্রেম বা স্থূল দেহ ইন্দ্ৰিয় আশ্রিত ভোগ-মোহ-লালসার প্রেমে পাগল নয়। তাঁদের প্রেম সূক্ষ্ম বা উচ্চস্তরের আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ঐশী প্রেম। তথা মানবাত্মার সাথে পরমাত্মার মহামিলন ঘটানোর প্রেম। এ প্রেম অর্থ আত্মার প্রেম যা ক্রমশ মানবিক দৈহিক কামজাত প্রেম থেকে পরম ঐশী প্রেমে পৌছায়। বাউলদের প্রেমতত্ত্বের একটি চিত্তাকর্ষক বর্ণনা দেন বাউল সম্রাট লালন শাহ। তিনি বলেন, “বাউল প্রেমতত্ত্ব, রমণী, যুবতী বা কামিনীর প্রেম নয়, কিংবা লোভী ও কামী ব্যক্তির পার্থিব ধর্ম, সম্পদ, দালানকোঠা, ঘরবাড়ি, স্ত্রীপুত্র, পরিবার পরিজন, প্রভাব প্রতিপত্তি, দম্ভ,অহংকার ইত্যাদির প্রতি আকর্ষণ নয়। লোভী, কামী প্রভৃতি শ্রেণির লোকের প্রেমরাজ্যে প্রবেশাধিকার নেই। এ প্রেম প্রাকৃতিক প্রেম নয় বরং কাম হতে প্রেমী উত্তীর্ণ হওয়ার ঐশ্বরিক প্রেম।
৯. ধর্মতত্ত্ব : বাংলার এক শ্রেণির মানুষের ধর্মবিশ্বাস, ধর্মচিন্তা, আধ্যাত্মচিন্তা তথা বাঙালি সাধারণ মানুষের জীবনের অভিব্যক্তিই হচ্ছে বাউল ধর্ম। বাউলরা মূলত গানের মাধ্যমে তাঁদের ধর্ম ও জীবন চিন্তা প্রকাশ করে। বাউল গানের বিষয়বস্তু একটি ধর্মতত্ত্ব ও সেই ধর্ম সাধনার ক্রিয়াকলাপ । বাউল ধর্ম বিভিন্ন ধর্মও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রভাবজাত একটি সমন্বয়মূলক ধর্মমত। বাউল ধর্ম ঐশী শাস্ত্র বা ঈশ্বর প্রত্যাদিষ্ট ধর্ম নয়। এ ধর্ম মানব রচিত তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। বাউলরা মনে করেন, মানুষ কোনো শাস্ত্র বা তত্ত্বের অধীন নয়। শাস্ত্র সে মানুষ প্রদত্ত বা ঈশ্বর প্রদত্ত হোক, শাস্ত্র কখনো মানুষের উপরে স্থান পেতে পারে না। বাউলদের ধর্মীয় আচার ‘রাগের আচার’ বেদ বা অন্য কোনো ধর্মীয় শাস্ত্রের আচার নয়।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, বাউল মতবাদ বা দর্শন মূলত সাধনকেন্দ্রিক। বাউল সাধনার উপাদান হিসেবেই বাউলবাদের তত্ত্বসমূহের উদ্ভব। এসব তত্ত্বসমূহকে ভিত্তি হিসেবে ধারণ করেই বাউল তার সাধন ক্রিয়া চালনা করেন। তবে উপযুক্ত সকল তত্ত্বই বাউল সাধনার জন্য অপরিহার্য নয়। কিংবা সকল তত্ত্বের সাধনাই সকল বাউল করেন।কোনো কোনো তত্ত্বের সাধনা না করেও সিদ্ধ বাউল হওয়া যায়।



পরবর্তী পরীক্ষার রকেট স্পেশাল সাজেশন পেতে হোয়াটস্যাপ করুন: 01979786079

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!