অথবা, ন্যায় দর্শনে পঞ্চ অবয়বী ন্যায় সংক্ষেপে আলোচনা কর।
অথবা, পঞ্চ অবয়বী ন্যায় কী?
অথবা, পঞ্চ অবয়বী ন্যায় সম্পর্কে নৈয়ায়িকদের মত কী?
অথবা, পঞ্চ অবয়বী ন্যায় কাকে বলে?
উত্তর৷ ভূমিকা :
ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন আস্তিক স্কুলসমূহের মধ্যে বস্তুবাদী দর্শন হিসেবে ন্যায়দর্শন স্বাধীন চিন্তা ও বিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং এ দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা হলেন মহর্ষি গৌতম। ন্যায়দর্শনের মূলভিত্তি হলো ‘ন্যায়সূত্র’। ন্যায়দর্শন যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত এবং বস্তুর জ্ঞান নিরপেক্ষ স্বাধীন সত্তায় বিশ্বাসী। ন্যায়দর্শনকে নামান্তরে তর্কশাস্ত্র, প্রমাণশাস্ত্র, হেতুবিদ্যা, বাদবিদ্যা এবং আন্বীক্ষিকী বিদ্যা বলা হয়। ন্যায়দর্শনের মূল ও প্রধান উপজীব্য বিষয় হলো জ্ঞানতত্ত্ব। নৈয়ায়িকরা জ্ঞানতত্ত্বের আলোচনায় বলেছেন প্রমাণ চার প্রকার। যথা : প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান ও শব্দ।
পঞ্চ অবয়বী ন্যায় (Five membered syllogism) : নৈয়ায়িকদের মতে, প্রত্যেক অনুমানে অন্তত তিনটি বচন থাকবে। এ তিনটি বচন নিরপেক্ষ হবে এবং সদর্থক বা নঞর্থক উভয়ই হতে পারে। যেভাবে সাধারণত অনুমান করা হয় এবং উপর্যুক্ত দৃষ্টান্তে আমরা যেভাবে অনুমান করছি তা হতে দেখা যায়- প্রথমে বচনে পক্ষ (পর্বত) হেতুর (ধূমের) প্রত্যক্ষ, দ্বিতীয় বচনে হেতুর (ধূমের) সঙ্গে সাধ্যের (অগ্নির) সার্বিক সম্পর্ক স্মরণ এবং তৃতীয় বচনে (পর্বত) সাধ্যের (অগ্নির) অস্তিত্ব অনুমান করা হয়। নৈয়ায়িকগণ একটি অনুমানকে পাঁচটি অবয়বের সাহায্যে ব্যক্ত করেছেন। পাঁচটি অবয়ব আছে বলে নৈয়ায়িকদের অনুমানকে পঞ্চ অবয়বী ন্যায় বলা হয়। এ অবয়বগুলোর নাম হলো :
১. প্রতিজ্ঞা বা প্রমাণের বিষয়;

  1. হেতু বা কারণ;
    ৩.উদাহরণ;
    যেখানে যেখানে ধূম আছে সেখানে সেখানে অগ্নি আছে।
    যেমন— পাকশালা (উদাহরণ)
    উপনয় বা উদাহরণের প্রয়োগ;
    পর্বত ধূমবান (উপনয়)
    নিগমন বা সিদ্ধান্ত |
    পর্বত অগ্নিমান (নিগমন বা সিদ্ধান্ত)
    হেতু ও সাধ্যের মধ্যে ব্যাপ্তি সম্বন্ধে প্রকৃতি বা স্বরূপের ভিত্তিতে নৈয়ায়িকগণ অনুমানকে তিনভাগে ভাগ করেন। যথা :
    ১. পূর্ববৎ, ২. শেষবৎ ও ৩. সামান্যতোদৃষ্ট।
    পর্বত অগ্নিমান (প্রতিজ্ঞা
    কারণ পর্বত ধূমবান (হেতু)
    ১. পূর্ববৎ : যেখানে প্রত্যক্ষ এবং তার থেকে যখন অপ্রত্যক্ষ কার্যের কথা অনুমান করা হয় তখন তাকে পূর্ববৎ অনুমান বলে । পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এ অনুমান করা হয়। যেমন- আকাশে মেঘ দেখে আমরা অনুমান করি যে, বৃষ্টি হবে। এখানে মেঘ হলো কারণ এবং বৃষ্টি হলো কার্য।
    ২. শেষবৎ : যেখানে প্রত্যক্ষ এবং তার থেকে যখন অপ্রত্যক্ষ কারণের কথা অনুমান করা হয় তখন তাকে শেষবৎ অনুমান বলে। যেমন— নদীর পরিপূর্ণতা ও স্রোতের প্রখরতা দেখে আমরা অতীত বৃষ্টির অনুমান করি।
    ৩. সামান্যতোদৃষ্ট : হেতু ও সাধ্যের মধ্যে ব্যাপ্তি সম্পর্ক থাকে কিন্তু কোন কার্য কারণ সম্পর্ক থাকে না তাকে সামান্যতোদৃষ্ট অনুমান বলে। যেমন- চন্দ্রের গতি অপ্রত্যক্ষ হলেও তা অনুমান করা।
    উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, পঞ্চ অবয়বী ন্যায়ে বচনগুলো খুবই স্বাভাবিকভাবে সাজানো হয়। কিন্তু পাশ্চাত্য ন্যায়ে প্রথমে একটি সার্বিক বচনের উল্লেখ করা হয় এবং পরে তাকে একটি বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় যা স্বাভাবিক নয়, এদিক থেকে বিবেচনা করলে পাশ্চাত্য ত্রি-অবয়বী ন্যায়ের তুলনায় ভারতীয় পঞ্চ অবয়বী ন্যায়ের গঠন-
    বিন্যাসকে অধিকতর যুক্তিযুক্ত ও সন্তোষজনক বলা যায়।
admin

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!