অথবা, ন্যায় মতে জ্ঞান কাকে বলে? জ্ঞানের প্রকারভেদ আলোচনা কর।
অথবা, নৈয়ায়িকদের মতে জ্ঞান কী? জ্ঞানের শ্রেণিকরণ কর।
অথবা, ন্যায় দার্শনিকরা কীভাবে জ্ঞানকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করেন? সেগুলো আলোচনা কর।
উত্তর৷ ভূমিকা
: ভারতীয় দর্শনের বিভিন্ন আস্তিক স্কুলসমূহের মধ্যে বস্তুবাদী দর্শন হিসেবে ন্যায়দর্শন স্বাধীন চিন্তা ও বিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং এ দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা হলেন মহর্ষি গৌতম। ন্যায়দর্শনের মূলভিত্তি হলো ‘ন্যায়সূত্র’ । ন্যায়দর্শন যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত এবং বস্তুর জ্ঞান নিরপেক্ষ স্বাধীন সত্তায় বিশ্বাসী। ন্যায়দর্শনকে নামান্তরে তর্কশাস্ত্র, প্রমাণশাস্ত্র, হেতুবিদ্যা, বাদবিদ্যা এবং আন্বীক্ষিকী বিদ্যা বলা হয়। ন্যায়দর্শনের মূল ও প্রধান উপজীব্য বিষয় হলো জ্ঞানতত্ত্ব। আমাদের আলোচ্যবিষয় ন্যায়দর্শনের জ্ঞানতত্ত্ব, যা নিম্নে আলোচনা করা হলো :
ন্যায় মতে জ্ঞান : ন্যায় মতে, জ্ঞান হলো বিষয়ের প্রকাশ। জ্ঞানের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে Chatterge & Datta বলেন, “Knowledge or cognition is the manifestation of object.” (An Introduction to Indian Philosophy, Page- 171) প্রদীপ যেমন ঘট, পট প্রভৃতি তার সম্মুখস্থ যাবতীয় বস্তুকে আলোকিত করে তেমনি আমাদের জ্ঞানও তার সম্মুখস্থ যাবতীয় বিষয়কে আমাদের সামনে প্রকাশিত করে। নৈয়ায়িকগণ জ্ঞানের মধ্যে দুটি ভাগ করেছেন । যথা:
১. ‘প্রমা’ বা যথার্থ জ্ঞান (Valid knowledge) ও
২. ‘অপ্রমা’ বা অযথার্থ জ্ঞান (Non-valid knowledge)।
১. ‘প্রমা’ বা যথার্থ জ্ঞান (Valid Knowledge) : জ্ঞান লাভের যে প্রণালি তাকে প্রমাণ বলা হয়। অর্থাৎ কোন বস্তু বা বিষয়ের অসন্দিগ্ধ ও যথার্থ অনুভবকে প্রমাণ বা যথার্থ জ্ঞান বলা হয়। ন্যায়দর্শনে যথার্থ অনুভবকে প্রমা বলা হয়। নৈয়ায়িকদের মতে, প্রমাণ (Valid Knowledge) চার প্রকার। যথা :
১. প্রত্যক্ষ;
২. অনুমান;
৩. উপমান ও
৪. শব্দ।
নৈয়ায়িকগণ স্বীকৃত উক্ত চারটি প্রমাণ সম্পর্কে আলোচনা করলে ন্যায়দর্শনের জ্ঞানতত্ত্ব সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যাবে।
প্রত্যক্ষ (Perception) : নৈয়ায়িকদের মতে, যথার্থ জ্ঞান লাভের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষের ভূমিকা অপরিসীম। ন্যায়দর্শনে চার প্রকার প্রমাণের মধ্যে প্রত্যক্ষের স্থান সর্বপ্রথম এবং সর্বপ্রধান। তাঁদের মতে, প্রত্যক্ষ ভিন্ন কোন প্রমাণই সিদ্ধ নয়। এমনকি অনুমান, উপমান এবং শব্দ সবই প্রত্যক্ষের উপর নির্ভরশীল। মহর্ষি গৌতমের মতে, প্রত্যক্ষ হলো বিষয় এবং ইন্দ্রিয়ের সন্নিকর্ষজনিত বিষয়ের নিশ্চিত এবং যথার্থ জ্ঞান। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বিষয়ের সন্নিকর্ষ থেকেই প্রত্যক্ষ জ্ঞানের উদ্ভব। প্রত্যক্ষণের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে Chatterge & Datta বলেন, “Perception is definite and true cognition of object produced by sense object contract.” (An Introduction to Indian Philosophy, Page- 174) ন্যায়দর্শনে প্রত্যক্ষকে আত্মার কার্য বলা হয়েছে। প্রত্যক্ষে প্রথম আত্মার সাথে মনের সংযোগ ঘটে। এরপর মনের সাথে ইন্দ্রিয়ের এবং ইন্দ্রিয়ের সাথে বস্তুর সংযোগে প্রত্যক্ষ হয়। মহর্ষি গৌতমের মতে, প্রত্যক্ষে চারটি উপাদান অন্তর্ভূক্ত। যথা :
ক. ইন্দ্ৰিয়;
গ. ইন্দ্রিয় ও বস্তুর সন্নিকর্ষ এবং
ঘ. সন্নিকর্ষ থেকে উৎপন্ন জ্ঞান।
উদাহরণস্বরূপ : আমার সম্মুখস্থ টেবিলের সঙ্গে যখন আমার চক্ষুরূপ সংযোগ ঘটে তখন টেবিল সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান হয় এবং আমি সুনিশ্চিত যে, যে বস্তুকে আমি প্রত্যক্ষ করছি তা একটি টেবিল। নব্য নৈয়ায়িক দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা গঙ্গেশৃউপাধ্যায় প্রত্যক্ষকে সাক্ষাৎ জ্ঞান বুঝিয়েছেন। পরবর্তীতে নব্য নৈয়ায়িকদের কেউ কেউ প্রত্যক্ষকে আবার সাক্ষাৎ বৈধ জ্ঞানকে বুঝান।
অনুমান (Inference) : অনুমান শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো জ্ঞানের পশ্চাৎগামী জ্ঞান। ‘অনু’ শব্দের অর্থ ‘পশ্চাৎ’ এবং ‘মান’ শব্দের অর্থ ‘জ্ঞান’। সাধারণ অর্থে অনুমান হলো সেই জ্ঞান যা অন্য জ্ঞানকে অনুসরণ করে। এ প্রসঙ্গে C hatterjee & Datta তাঁদের ‘An Introduction to Indian Philosophy’ গ্রন্থে বলেন, “Aunumāna
(anu-after, māna – knowledge ) literally means a cognition or knowledge which follows some (Page- 180)
other knowledge. .”. যখন কোন জ্ঞাত বিষয়ের উপর নির্ভর করে এবং তার দ্বারা সমর্থিত হয়ে কোন অজ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা হয়। তখন তাকে অনুমিতি বলে। অনুমিতি হলো পরোক্ষ জ্ঞান। কাজেই কোন একটি বিষয়কে প্রত্যক্ষ করে সেই প্রত্যক্ষ জ্ঞানের ভিত্তিতে অপর একটি অজ্ঞাত বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করার প্রক্রিয়াকে অনুমান বলে। অনুমান হলো পরোক্ষ জ্ঞান, প্রত্যক্ষ জ্ঞান নয়। সুতরাং অনুমান হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যে প্রক্রিয়ায় আমরা কোন হেতু বা লিঙ্গ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করি ।
উদাহরণ : পর্বতটি বহ্নিমান, যেহেতু পর্বতটি ধূমবান এবং যেখানেই ধূম সেখানেই বহ্নি।

আলোচ্য উদাহরণে ধূম প্রত্যক্ষ করে তারই মাধ্যমে আর একটি বস্তু বহ্নি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা হয়, যেহেতু সেই বস্তুটিতে হেতু বা লিঙ্গ অবস্থিত এবং হেতু বা লিঙ্গ ও সেই বস্তুটির মধ্যে ব্যাপ্তি সম্বন্ধ বর্তমান।
উপমান (Comparison) : নৈয়ায়িকদের মতে, উপমানও যথার্থ জ্ঞান লাভের একটি উপায় বা প্রমাণ। পরিচিত কোন বস্তুর সঙ্গে অপরিচিত কোন বস্তুর সাদৃশ্য লক্ষ্য করে ঐ অপরিচিত বস্তুটি সম্পর্কে জ্ঞান লাভের যে পদ্ধতি তাকে বলা হয় উপমান এবং উপমানলব্ধ জ্ঞানকে বলা হয় উপমিতি। উপমান সম্পর্কে Chatterge & Datta বলেন, “Upamána is the process of naming objects through a given description.” (An Introduction to Indian Philosophy, Page- 196)
অন্নম ভট্ট বলেন, ‘সংজ্ঞাসংজ্ঞিসম্বন্ধজ্ঞানম্ উপমিতিঃ’। সংজ্ঞা সংজ্ঞীর সম্বন্ধ জ্ঞানের নাম উপমিতি। সংজ্ঞা শব্দের অর্থ নাম, আর সেই সংজ্ঞার দ্বারা যে বস্তুকে বুঝায় সেই বস্তু হলো সংজ্ঞী বা নামী। গাহলে নাম ও সেই নামের দ্বারা নির্দেশিত বস্তুর মধ্যে যে সম্বন্ধ তার জ্ঞানকে উপমিতি বলে। এ সম্বন্ধ সম্পর্কে জ্ঞানের করণ হলো সাদৃশ্যজ্ঞান। সাদৃশ্যজ্ঞানই উপমিতির করণ উপমান। অন্নম ভট্টের মতে, উপমানের মধ্যে দুটি বিষয় আছে। যথা :
১. পূর্বে প্রত্যক্ষ করা হয় নি এমন একটি অপরিচিত বস্তু সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করা এবং
২. অপরিচিত বস্তুটির সাথে পূর্বপরিচিত বস্তুটির সাদৃশ্যের জ্ঞান।
উদাহরণস্বরূপ : কোন ব্যক্তি বন্য গাভী দেখে নি। বনে প্রবেশ করার পথে একজন অরণ্যবাসী বলে দিল যে বন্য গাভী দেখতে গরু সদৃশ। বনে ঢুকে গরু সদৃশ একটি নতুন প্রাণী দেখে ঐ ব্যক্তি মনে করল ঐ নতুন প্রাণীটিই বন্য গাভী। এ উদাহরণে বন্য গাভীর সংজ্ঞা বা বর্ণনার ভিত্তিতে সংজ্ঞীয় অর্থাৎ বন্য গাভীর জ্ঞান লাভ হলো।
শব্দ (Testimony) : নৈয়ায়িকদের মতে, শব্দও যথার্থ জ্ঞান লাভের একটি স্বতন্ত্র প্রমাণ। তাঁদের মতে, শব্দ হলো বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তির বচন বা আপ্তবাক্য। আপ্ত ব্যক্তি হলে তিনি সত্য জানেন এবং সত্য বলেন। শব্দ বা আপ্ত বাক্য হতে যে জ্ঞান লাভ করা যায় তাই শব্দ জ্ঞান। যেসব বিষয় সম্পর্কে প্রত্যক্ষ, অনুমান ও উপমানের সাহায্যে জ্ঞান লাভ করা যায় না। সেসব বিষয় সম্পর্কে শব্দের সাহায্যে জ্ঞান লাভ করা যায়। শব্দ সম্পর্কে Chatterge & Datta বলেন, “Sabda consists in understanding the meaning of the statement of a trustworthy person.” (An Introduction to Indian Philosophy, Page- 198)। বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি, মুনি-ঋষি বা শাস্ত্রের বাক্য হলো শব্দ প্রমাণ।
২. ‘অপ্রমা’ বা অযথার্থ জ্ঞান (Non-valid knowledge) : ন্যায়দর্শনে অপ্রমাণকেও চারভাগে ভাগ করা হয়েছে।
যথা : স্মৃতি, সংশয়, ভ্রম বা বিপর্যয় ও তর্ক। নৈয়ায়িকদের মতে, স্মৃতি যথার্থ জ্ঞান নয়। কারণ স্মৃতি প্রত্যক্ষ অনুভব নয়। স্মৃতির ক্ষেত্রে পূর্বানুভূত আবেগকে মানসপটে জাগরিত করা হয় মাত্র। সংশয়ও যথার্থ জ্ঞান নয়। কারণ সংশয় নিশ্চিত জ্ঞান নয়। ভ্রমকেও প্রমাণ বা যথার্থ জ্ঞান বলা যায় না। কারণ ভ্রম জ্ঞান যথার্থ জ্ঞান নয়। যেমন: কোন একটি রজ্জুতে যখন সর্পভ্রম করি তখন রজ্জুতে সর্পের অনুভূতিটি যথার্থ নয়। কারণ সর্পত্ব রজ্জুতে উপস্থিত নেই। আবার তর্কও প্রমাণ নয়। কারণ তর্কের দ্বারা বিষয় বা বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায় না। কেবল প্রত্যক্ষ বা অনুমানজাত জ্ঞানকে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। তর্ক প্রমাণের সহায়ক মাত্র, প্রমাণ নয়।
সমালোচনা : ন্যায়দর্শনের জ্ঞানতত্ত্ব নিম্নলিখিতভাবে সমালোচিত হয়েছে-
প্রথমত, ন্যায়দর্শন মতে, দ্রব্য, গুণ সম্পর্কিত সমস্ত উপাদানকে নির্বিকল্প প্রত্যক্ষে সম্বন্ধ-রহিতভাবে গ্রহণ করা হয়। এ উপাদানগুলোকে উপাত্ত বলা হয়। কিন্তু এসব উপাত্তের স্বরূপ কী? তা ন্যায় প্রত্যক্ষ প্রমাণতত্ত্বে সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না।
দ্বিতীয়ত, ন্যায়দর্শন মতে নির্বিকল্প প্রত্যক্ষ ব্যতীত সবিকল্প প্রত্যক্ষ হয় না। কিন্তু সবক্ষেত্রে এটি সঠিক নয়। যেমন- অতিবেগুনি রশ্মি সম্পর্কে ধারণা থাকলেও তেজস্ক্রিয়তার জন্য এসব রশ্মির সংবেদোপাত্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয় না।
তৃতীয়ত, সাদৃশ্য সম্পূর্ণ-অসম্পূর্ণ যাহোক না কেন তা কখনো উপমানের মাধ্যমে জ্ঞানলাভের পর্যাপ্ত ভিত্তি নয়।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, নৈয়ায়িক জ্ঞানতত্ত্বের আলোচনা ভারতীয় দর্শনের এক অমূল্য সম্পদ। ভারতীয় দর্শন যে বিচার-বিযুক্ত নয় এবং অতিসূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণের উপর প্রতিষ্ঠিত তা নৈয়ায়িকদের জ্ঞানতত্ত্বের আলোচনায় প্রমাণিত হয়।

admin

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!