অথবা, ন্যায়দর্শন অনুসারে জীবাত্মার স্বরূপ ব্যাখ্যা কর। জীবাত্মার অস্তিত্ব কীভাবে প্রমাণ করা যায়?
অথবা, ন্যায় আত্মাতত্ত্ব ব্যাখ্যা কর। জীবাত্মার অস্তিত্ব কীভাবে প্রমাণ করা যায় আলোচনা কর।
অথবা, নৈয়ায়িকদের জীবাত্মা সম্পর্কীত মত আলোচনা কর। তারা কীভাবে জীবাত্মার অস্তিত্ব প্রমাণ করেন?
অথবা, নৈয়ায়িকদের মতে জীবাত্মার ধারণাটি ব্যাখ্যা কর।
উত্তর৷ ভূমিকা :
ন্যায়দর্শন আস্তিক বস্তুবাদী দর্শন। মহর্ষি গৌতম ন্যায়দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি আবার অক্ষপাদ নামেও পরিচিত। তার নামানুসারে তার দর্শনকে অক্ষপাদ দর্শনও বলা হয়। গৌতমের ‘ন্যায়সূত্র’ ন্যায়দর্শনের প্রথম রচনা হিসেবে স্বীকৃত। ন্যায়দর্শন প্রধানত যথার্থ জ্ঞান লাভের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করে। কি উপায়ে বা কোন কোন বিধি অনুসরণ করে যুক্তিতর্ক করলে আমরা যথাযথ জ্ঞান লাভ করতে পারি ন্যায়দর্শন প্রধানত তারই আলোচনা করে। এ কারণে ন্যায়দর্শনকে ‘তর্কশাস্ত্র’ বা বাদবিদ্যাও বলা হয়। ন্যায়দর্শনের আলোচ্যবিষয়কে চারভাগে ভাগ করা যায় ।
যথা : ক. জ্ঞানতত্ত্ব; খ. জগত্তত্ত্ব; গ. জীবাত্মার স্বরূপ ও মুক্তিতত্ত্ব এবং ঘ. ঈশ্বরতত্ত্ব।
নিম্নে জীবাত্মা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :
ন্যায় আত্মতত্ত্ব : ন্যায় দর্শনে দুই প্রকারের আত্মাকে স্বীকার করা হয়। যথা : ১. জীবাত্মা এবং ২. পরমাত্মা ।
জীবাত্মা : ন্যায় মতে, আত্মা একটি অজৈবিক দ্রব্য। এটি নিত্য ও সর্বব্যাপী। দেশ ও কাল আত্মাকে সীমিত করতে পারে না। নৈয়ায়িকদের মতে, এক একটি দেহে এক একটি আত্মা বিদ্যমান এবং চৈতন্য আত্মার একটি আগন্তুক গুণ। ইন্দ্রিয় যখন বিষয় সংশ্লিষ্ট হয় তখন দেহস্থিত আত্মায় চৈতন্যরূপ গুণের আবির্ভাব হয়। আর আত্মা যখন দেহ বিযুক্ত হয়। তখন তাতে আর চৈতন্যরূপ থাকে না। চৈতন্য ছাড়াও আত্মার অনেক গুণ আছে; যথা : রাগ, দ্বৈষ, বুদ্ধি, সুখ, দুঃখ ইত্যাদি। তারা আরও বলেছেন, যে কোন গুণ কোন না কোন দ্রব্যকে আশ্রয় করে অবস্থান করে। রাগ, দ্বেষ, বুদ্ধি প্রভৃতি গুণগুলো ভৌতিক নয়। তাই তারা ভৌতিক দ্রব্যকে আশ্রয় করে থাকতে পারে না। সুতরাং এ গুণগুলো কোন অভৌতিক দ্রব্যকে আশ্রয় করে অবস্থান করতে হয়। সেই অভৌতিক দ্রব্যই হলো আত্মা। নিম্নে জীবাত্মার স্বরূপ আলোচনা করা হলো :
আত্মা দেহ নয় : ন্যায়দর্শন অনুসারে আত্মা সম্পর্কে চার্বাকদের মতবাদ সত্য হতে পারে না। কারণ আত্মা দেহ নয়। দেহ জড়পদার্থ বলে চৈতন্যহীন; কিন্তু আত্মা চৈতন্যময়। দেহ পরিবর্তনশীল এবং জন্ম-মৃত্যুর অধীন। কিন্তু আত্মা অপরিবর্তনীয় ও নিত্য। আত্মার জন্যও নেই, মৃত্যু নেই।
আত্মা ইন্দ্রিয় নয় : ন্যায় মতে, আত্মা ইন্দ্রিয় নয়। কারণ কল্পনা, স্মৃতি, চিন্তা প্রভৃতি মানসিক প্রক্রিয়াগুলো ইন্দ্রিয়নির্ভর নয়। ইন্দ্রিয় নষ্ট হলেও চিন্তা, কল্পনা প্রভৃতি চলতে পারে। আত্মাকে যদি ইন্দ্রিয় মনে করা হয় তবে কল্পনা, স্মৃতি, চিন্তা প্রভৃতি মানসিক প্রক্রিয়াগুলোকে ব্যাখ্যা করা যায় না।
আত্মা মন নয় : ন্যায় মতে আত্মা মন হতে পারে না। আত্মা যদি মন হয় তবে সুখ, দুঃখ, ইচ্ছা প্রভৃতি আত্মার গুণগুলোকেও মনের গুণ বলতে হয়। ন্যায় মতে, মন অণুপরিমাণ, তাই প্রত্যক্ষযোগ্য নয়। কাজেই সুখ, দুঃখ প্রভৃতি মনের গুণ বলে মনের ন্যায় এরাও প্রত্যক্ষযোগ্য নয়। কিন্তু আসলে সব মানুষই সুখ, দুঃখ প্রভৃতি প্রত্যক্ষ করে থাকে।
আত্মা পরিবর্তনশীল মানসিক প্রক্রিয়ার প্রবাহ নয় : ন্যায় মতে আত্মা পরিবর্তনশীল মানসিক প্রক্রিয়ার ধারা বা প্রবাহ নয়। আত্মাকে যদি পরিবর্তনশীল মানসিক প্রক্রিয়ার ধারা বা প্রবাহ বলে মনে করা হয় তবে স্মৃতি এবং প্রত্যভিজ্ঞাকে Recognition) ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ পরিবর্তনশীল মানসিক প্রক্রিয়ার ধারা বা প্রবাহের যে ক োন একটি তার পূর্ববর্তী বা পরবর্তী কোন প্রক্রিয়াকে জানতে পারে না। তাই স্মৃতি বা প্রত্যভিজ্ঞা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সকল মানুষই অল্পবিস্তর স্মরণ করতে পারে এবং করে থাকে। কাজেই অপরিবর্তিত আত্মার অস্তিত্ব স্বীকার করতেই হয় এবং এ আত্মা আছে বলেই স্মৃতি এবং প্রত্যভিজ্ঞা সম্ভব হয়।
আত্মা বিশুদ্ধ চৈতন্য নয় : ন্যায় মতে আত্মা সম্পর্কে অদ্বৈত বৈদান্তিকদের মতবাদও গ্রহণ করা যায় না। তাদের মতে আত্মা বিশুদ্ধ চৈতন্যস্বরূপ। কিন্তু ন্যায় মতে, কোন আধারকে আশ্রয় না করে চৈতন্যের অস্তিত্বও সম্ভব নয়। কাজেই চৈতন্যের আধারস্বরূপ আত্মাকে স্বীকার করতে হবে।
আত্মা চৈতন্য বিশিষ্ট দ্রব্য : ন্যায়দর্শন অনুসারে আত্মা একটি চৈতন্য বিশিষ্ট দ্রব্য। আত্মা হলো কর্তা, জ্ঞাতা, ভোক্তা এবং অহংকারের আশ্রয় বা অহংপদবাচ্য। দেহ, ইন্দ্রিয়, মন-এসবই আত্মার করণ (Instrument)।
জীবাত্মার অস্তিত্ব যেভাবে প্রমাণ করা যায় : প্রাচীন নৈয়ায়িকদের মতে, আত্মাকে সাক্ষাৎভাবে জানা যায় না তবে অনুমান বা আপ্ত বাক্যের সাহায্যে জানা যায়। আমাদের ইচ্ছা, সুখ, দুঃখ, প্রভৃতির অস্তিত্ব স্বীকার করতেই হয়। কিন্তু কোন স্থায়ী আত্মার অস্তিত্ব যদি স্বীকার করা না হয় তবে এগুলোকে ব্যাখ্যা করা যায় না। যেমন কোন একটি বস্তুকে সুখপ্রদ মনে করলে তা পেতে চেষ্টা করি। কিন্তু কোন বস্তু সুখপ্রদ না দুঃখপ্রদ তা কিভাবে নির্ণয় করা যাবে? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়, অতীতে যে বস্তুকে লাভ করে সুখ পেয়েছি তার সাথে এ বস্তুর সাদৃশ্য আছে বলে একে সুখপ্রদ মনে করি। যদি কোন স্থায়ী আত্মা না থাকে তবে অতীতের অভিজ্ঞতাকে স্মরণ করবে কে? এবং অতীতের বস্তুর সাথে যে এ বস্তুর সাদৃশ্য আছে তাও লক্ষ্য করবে কে? সুতরাং ইচ্ছা, সুখ বা দুঃখের অনুভূতি স্থায়ী আত্মার অস্তিত্ব প্রমাণ করে। নব্য নৈয়ায়িকেরা বলেছেন, মানস প্রত্যক্ষের সাহায্যে আত্মাকে সোজাসুজি জানা যায়। আমাদের মনের সাথে যখন শুদ্ধ আত্মার সংযোগ ঘটে তখন আত্মা সম্পর্কে আমাদের সাক্ষাৎ জ্ঞান জন্মে। যখন আমরা বলি, আমি আছি তখন আমাদের আত্মা সম্পর্কে জ্ঞান প্রকাশিত হয়। আবার কোন কোন নৈয়ায়িকরা বলেছেন, শুদ্ধ আত্মাকে সোজাসুজি প্রত্যক্ষ
করা যায়। যেমন- একটি কমলার রং, আকার প্রভৃতি গুণগুলো সোজাসুজি প্রত্যক্ষ করে আমরা বলি যে, আমরা উক্ত গুণগুলোর আধাররূপ কমলাটির অস্তিত্ব প্রত্যক্ষ করি। তেমনি ইচ্ছা, সুখ, দুঃখ, প্রভৃতি আত্মার গুণগুলোকে সোজাসুজি প্রত্যক্ষ করে এ গুণগুলোর আধাররূপী আত্মাকে প্রত্যক্ষ করি। আমাদের এ জ্ঞান প্রকাশিত হয় তখন, যখন বলি আমি ইচ্ছা করি, আমি সুখী আমি দুঃখী ইত্যাদি। কিন্তু অপরের আত্মাকে জানতে হলে তাদের ক্রিয়াকে প্রত্যক্ষ করে তাদের আত্মার অস্তিত্ব অনুমান করে নিতে হয়।
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ন্যায় মতে, জীবাত্মা একটা দ্রব্য যা স্বরূপত অচেতন এবং নির্গুণ। দেহের সাথে সংযোগের ফলেই আত্মায় চেতনার আবির্ভাব ঘটে। কিন্তু সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষের সাহায্যেই আমরা জানতে পারি যে, আত্মা এক চৈতন্যময় সত্তা। চৈতন্য আত্মার গুণ নয়, আত্মার সারধর্ম।

admin

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!